ফের মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল জেলা শহর বহরমপুরের কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি জবর দখলের। কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি কমিটির সভাপতি সানুয়ার সেখ গত বছরের ৩১ জুলাই মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদকে লিখিত অভিযোগে বলেন, মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ ওয়াকফ সম্পত্তির উপর নির্মিত দোকান ঘরের উপর দোতলা বিল্ডিং তৈরি করছে। এই বিল্ডিং তৈরি করার যথাযথ কোন অনুমোদন জেলা পরিষদ নেয়নি এবং এই দোতলা বিল্ডিং তৈরি করা বন্ধ করা হোক। জেলা পরিষদ কোন ব্যবস্থা গ্ৰহণ না করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি কমিটির সভাপতি সানুয়ার সেখ গত ১৬ জুলাই ওয়াকফ বোর্ডের সিইও কে লিখিত আবেদনে সমস্ত বিষয় জানিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করার দাবি জানান। সিইও ১৮ জুলাই মুর্শিদাবাদ জেলা শাসককে এক চিঠিতে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলেন। আজ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ চলছে।
কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি মূলত কবরস্থান। কারবালা কবরস্থান বলেই পরিচিত। বহরমপুর শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে শিবডাঙ্গা বদরপুর মৌজায় অবস্থিত। তৌজি নং ১০৬২, জে এল নং ৭৯ । খতিয়ান নং ৩৭৭ এবং ৪৩৭। ইসি নং ১২৩৭৭।
মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিঘা। ২০০২/৩ সালের দিকে সিপিআইএম আমলে মুর্শিদাবাদ জেলার সম্পত্তি বা কবরস্থানের ৩৭৭ খতিয়ানের ২৩৩ দাগের একাংশ ১ খতিয়ানে নিয়ে আসেন এবং ২৩৩ দাগের উপর ১২৮ খানা দোকান ঘর নির্মাণ করেন। বর্তমানে ওই ১২৮ খানা ঘরের উপর দোতলা করা হচ্ছে। এই দোতলা নির্মাণ নিয়েই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আর এস খতিয়ান নং ২৩৩, ৪৮/২০৪, ৪৮/২০৫, ১৩৪/২২০, ৪৮, ১৩৪, ২০০২ সাল থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে এই খতিয়ান নংগুলি পরিবর্তন করে ১ নং খতিয়ান করা হয়েছে। ৩৭৭ খতিয়ানের ২৩৩ দাগ পরিবর্তন করে ১ নং খতিয়ান করে তার উপর ১২৮ খানা দোকান ঘর করেছিল। সেই সময় জেলা পরিষদের এই জবর দখলের বিরুদ্ধে জন অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলে আন্দোলন শুরু হয়। অনেক পানি ঘোলা হওয়ার পর ২০০৭ সালে বহরমপুর মহকুমা আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে একটি মিমাংসা করা হয়।
মিমাংসা করা হয় এই যে, জবর দখল হয়ে যাওয়া জমি এখন উদ্ধার করতে গেলে অনেক বড় সমস্যা তৈরি হবে। আপাতত সমস্যা থাকুক। বর্তমানে যতটুকু কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটুকু মাপযুক করে সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হবে। সরকার আমিন, পুলিশ, অর্থ দেবে। মতুয়াল্লী কমিটি দেখে নেবেন। সেই মতো কাজও হয়। এরপর বছর খানেক আগে জেলা পরিষদ আবার দোতলা নির্মাণ শুরু হলে বর্তমান সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, (জেলা পরিষদ) এর সাথে ওয়াকফ সম্পত্তি মুতাওয়াল্লী কমিটি দু’বার আলোচনায় বসে কোন সমাধান সূত্র বের করতে পারেননি।
জেলা পরিষদের বক্তব্য ১২৮ খানা ঘর তৈরি করা হয়েছে জেলা পরিষদের জমিতে। মুতাওয়াল্লী কমিটি বক্তব্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে ওয়াকফ সম্পত্তিতে। ২৩৩ দাগ এবং ২৩৪ দাগ পাশাপাশি। উভয়ের মাঝখানে আছে নয়নজুলি। নয়নজুলির আলাদা কোন দাগ নং নেই। জেলা পরিষদের দাবি নয়নজুলি ২৩৪ দাগের অংশ এবং এই নয়নজুলিতে ঘর করা হয়েছে।
মুতাওয়াল্লী কমিটির দাবি নয়নজুলি ২৩৩ দাগের অংশ এবং ঘর করা হয়েছে ২৩৩ দাগের কিছু অংশ নিয়ে নয়নজুলিতে। ফলে সমস্যা দাঁড়াই নয়নজুলি ২৩৩ দাগের অংশ, না ২৩৪ দাগের অংশ এর সমাধান করা। আগামীতে আবারও বসে সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। বহরমপুর শহরের বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, কাঁদাই মসজিদ কমিটির মুতাওয়াল্লী, মুর্শিদাবাদ কবরস্থান বাঁচাও কমিটির সদস্য ডাঃ এম আর ফিজা-র বক্তব্য সিএস এবং আর এস মানচিত্র অনুযায়ী নয়নজুলি ২৩৩ দাগের অংশ। নয়নজুলি ধরেই মানচিত্র অনুযায়ী জমির পরিমাণ পূরণ হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ৩৭৭ খতিয়ানের ২৩৩ দাগের খতিয়ান পরিবর্তন করে ১নং খতিয়ান করা হয়েছে কীসের ভিত্তিতে? এটা হয়েছে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। পরবর্তীতে খতিয়ান নং পরিবর্তন করে করা হয়েছে ১০৯৪ । এ সব কীভাবে করা হয়েছে তা নিয়ে সবাই জেলা পরিষদকে দায়ী করছেন। আরও একটি বিষয় সমস্যা তৈরি করেছে। ২৩৩ এবং ২৩৪ দাগের মাঝে একটি রাস্তা আছে। মুতাওয়াল্লী কমিটির দাবি ওই রাস্তা কবরস্থানের তথা ওয়াকফ সম্পত্তির অংশ। অন্য দিকে জেলা পরিষদের দাবি ওই রাস্তা বৃটিশ আমল থেকেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের যা বর্তমান জেলা পরিষদের পূর্ব নাম। অনেকের অভিযোগ বামফ্রন্ট আমলের শেষ দিকে রাজ্যের কবরস্থানগুলিকে ১ নং খতিয়ানে নিয়ে আসে। তার অর্থ ওয়াকফ সম্পত্তিগুলিকে সরকারি সম্পত্তিতে রুপান্তরিত করা হল। তা হলে বর্তমানে ১নং খতিয়ানে থাকা সমস্ত কবরস্থান কাগজে কলমে সরকারি সম্পত্তি। নতুন ওয়াকফ আইন (সংশোধীত) ২০২৫ বাস্তবায়ন হলে ১ নং খতিয়ানে থাকা কবরস্থান সরকার জবর দখল করে নেবে।
বহরমপুর শহরের বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং মুর্শিদাবাদ জেলা ওয়াকফ সম্পত্তি সুপারভাইজার কমিটির সদস্য ডাঃ এম হাসনাৎ জানান, কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তিসহ আরও কয়েকটি ওয়াকফ সম্পত্তি বা কবরস্থান ঠিক মতো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। স্থানীয় লোকজন নানা রকম ভাবে বাঁধা সৃষ্টি করছে। যেমন বারো বিঘা কবরস্থান এর জায়গায় রাণী স্বর্ণময়ীর মূর্তি বসানোর অন্যায় বায়না ধরেছে স্থানীয় কিছু মানুষ। আগেই দেড় বিঘা জমি বেদখল হয়ে গেছে। বাইশ পল্লী ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে বাজার বসাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। কারবালা কবরস্থানের অনেক জায়গা দখল করেছিল সিপিআইএম পরিচালিত জেলা পরিষদ। আজও তা উদ্ধার হয়নি। এখন তো তার উপর দোতলা বিল্ডিং তৈরি করছে তৃণমূল পরিচালিত জেলা পরিষদ।
তিনি আরও জানান, ১ নং খতিয়ান সংশোধন করার জন্য জেলা শাসকের কাছে দেখা করে আবেদন করেছিলেন। জেলা শাসক স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন ১ নং খতিয়ান সংশোধন তিনি করতে পারবেন না। নবান্ন থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। এসডিপিআই এর জাতীয় সম্পাদক তায়েদুল ইসলাম এর অভিযোগ বহরমপুর শহরে ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের সূচনা হয়েছিল কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর হাত ধরে। পরে তাতে গতি আনে সিপিআইএম এবং এখন সেই ট্রাডিশন সমানে চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল।
সিপিআইএম এর জেলা অফিস ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সেই অফিসের পাশেই ওয়াকফ সম্পত্তি যা ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল তা দক্ষিণবঙ্গ রাজ্য পরিবহণ নিগম কে দেওয়া হয়েছে বাস টার্মিনাল করার জন্য। এক সময় মাঠটি শিশু উদ্যান হিসেবেও ব্যবহার করা হোত। সামান্য অংশ ফাঁকা আছে যা বর্তমানে ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই মহৎ(!) কাজটি করেছেন আজকের বিজেপি নেতা ও তৎকালীন তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি তখন দলের পক্ষে মুর্শিদাবাদ জেলার পর্যবেক্ষক ছিলেন।
কারবালা কবরস্থান বিষয়ে তিনি আরও বলেন, প্রথম যখন সিপিআইএম পরিচালিত জেলা পরিষদ দখল করে তখন তিনি কলম পত্রিকায় কয়েকটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন। তখনই জানা গিয়েছিল কারবালা কবরস্থানের মোট জমি ২৮৫ বিঘা। প্রায় দুশো বিঘাই জবর দখল হয়ে গেছে। জেলা পরিষদ করেছে ১২৮ খানা ঘর। এমনও অভিযোগ আছে জেলা পরিষদ যে জমির উপর অবস্থিত সেই জমিও ওয়াকফ সম্পত্তি। পাশে চালপট্টি এবং গ্লুকাল হাসপাতালও কারবালা কবরস্থানের জমি জবর দখল করে করা হয়েছে। এই জায়গাও ওয়াকফ সম্পত্তি বলে অনেকেই দাবি করেন।
কয়েক জন এলাকাবাসী অভিযোগ করলেন, ওয়াকফ মুতাওয়াল্লী কমিটির একাংশ দোতলা বিল্ডিং করার ষড়যন্ত্রে যুক্ত। ১২৮ টি থেকে ভাড়া হিসেবে যে টাকা আয় হচ্ছে তার সবটাই জেলা পরিষদের তহবিলে জমা পড়ছে কি না সন্দেহ। তাদের ধারণা সে আয়ের একটা ভাল অংশ তারাই খাচ্ছে যারা দোতলা বিল্ডিং তৈরি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হল মুতাওয়াল্লী কমিটি এবং ওয়াকফ বোর্ড এই জবর দখল রুখতে বা পুনরুদ্ধার করতে কী ভূমিকা পালন করেছে? স্থানীয় জনগণের বক্তব্য, কখনোই যোগ্য লোকদের মুতাওয়াল্লী কমিটিতে নেওয়া হয় না। তারাই দুর্নীতি করে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের নেতারাই মুতাওয়াল্লী কমিটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ, মুতাওয়াল্লী কমিটির একাংশ এবং সরকারি আধিকারিকদের একাংশ মিলিত ভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি জবর দখলের কাজ রাজ্যের সর্বত্রই করে চলেছে। সেই ধারাবাহিকতায় মুর্শিদাবাদ দূরে থাকবে কেন?
খুলনা গেজেট/এনএম