খুলনা, বাংলাদেশ | ১২ বৈশাখ, ১৪৩১ | ২৫ এপ্রিল, ২০২৪

Breaking News

  রাঙামাটির সাজেকে শ্রমিকবাহী মিনি ট্রাক পাহাড়ের খাদে পড়ে ৯ জন নিহত

১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন

গেজেট ডেস্ক

পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনার অন্যতম কারণগুলো জানা গেছে। এই দুর্ঘটনার জন্য চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৪টি প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। বুধবার সকালে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কমিটির প্রধান মাদারীপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) পল্লব কুমার হাজরা।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইমাদ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটির গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সাময়িক স্থগিত রাখার পরও ফিটনেসের মেয়াদ উত্তীর্ণ থাকায় তা এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের উপযোগী ছিল না। চলাচলের অনুপযোগী গাড়িটির সময়ে সময়ে গতি বৃদ্ধিকে এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া চালকের পেশাদার মধ্যম লাইসেন্স থাকলেও তিনি ভারী গাড়িটি চালিয়েছেন, এতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে বলা হয়েছে। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় চালকের ঘুমঘুম চোখে অসচেতনতায় পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে প্রতিবেদনে দুর্ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির বিষয়ে বলা হয়, এক্সপ্রেসওয়ের উভয় পাশে গার্ড রেইল স্থাপন না থাকায় গাড়িটি বিনা বাধায় রাস্তার পাশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পতিত হয়, যার ফলে মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলকারী দ্রুতগতিসম্পন্ন গাড়িতে সবার সিটবেল্ট পরিধান নিশ্চিত না করার কারণে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গাড়ির ইন্টেরিয়রও যথাযথ নরম বস্তু দিয়ে তৈরি না করায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের মাত্রা বেড়েছে।

এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমাতে ১৪টি সুপারিশ রেখেছে তদন্ত কমিটি। সুপারিশে বলা হয়েছে, চালক ও সংশ্লিষ্ট সবার লাইসেন্স এবং একটি গাড়ির সব বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত করে মহাসড়কে গাড়ি পরিচালনা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলকারী দ্রুতগতিসম্পন্ন গাড়ির যাত্রীদের সিটবেল্ট পরিধান নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া। গাড়ির ইন্টেরিয়র নরম বস্তু দিয়ে তৈরি করা এবং এক্সপ্রেসওয়ের উভয় পাশে গার্ড রেইল স্থাপন করা।

ভবিষ্যতে নির্মিতব্য এক্সপ্রেসওয়েতে একমুখী রাস্তায় কমপক্ষে তিন লেনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি- অর্থাৎ উভয় মুখে কমপক্ষে ছয় লেনের ব্যবস্থা করা। লম্বা সরলরৈখিক রাস্তায় হালকা রাম্বল স্ট্রিপের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়ির সব হালনাগাদ তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেইজে রেখে তাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরসমূহের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলকারী গাড়ির গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত জনবল ও টহল গাড়িসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাসের নিজস্ব চেকপয়েন্টে যাত্রীসংখ্যা চেক করার পাশাপাশি গাড়ির আগমনের সময় সংরক্ষণ ও তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা।

দুর্ঘটনায় আঘাতের মাত্রা কম থাকলেও দ্রুত সেবা না পাওয়ায় মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় এক্সপ্রেসওয়ের নির্দিষ্ট দূরত্বে ট্রমা সেন্টার ও হাসপাতালের ব্যবস্থা রাখা। যাত্রীদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট পরিবহনের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা আবশ্যক, যাতে করে আহত ও নিহত যাত্রীদের চিহ্নিত করা সহজতর হয়। দুর্ঘটনা কমানো এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর করার লক্ষ্যে প্রতিটি গাড়িতে এবং মহাসড়কে জিপিএস ট্র্যাকার রাখা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও অনলাইনে তা মনিটরিং করার ব্যবস্থা রাখা। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে রাতে, ভোরে ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গাড়ির গতিসীমা অপেক্ষাকৃত কমিয়ে গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। এক্সপ্রেসওয়ের প্রতিটি গাড়ির গতিবেগ ডিজিটাল ডিসপ্লেতে প্রদর্শন করে চালকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া।

তদন্ত কমিটির প্রধান মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) পল্লব কুমার হাজরা বলেন, এ ঘটনায় আমরা তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেছি দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল, তাই গাড়ির রেজিস্ট্রেশনটি স্থগিত করা হয়েছিল। বাসটি হাইওয়ে সড়কে চলাচলের অনুপযোগী ছিল। এই বাসটির চালক এক্সপ্রেসওয়েতে বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত গতিতে চালাচ্ছিল। বাসটির ফিটনেস সনদ মেয়াদোত্তীর্ণ থাকায় অতিরিক্ত গতিতে চালানোর উপযোগী ছিল না। এ ছাড়া চালকের ভারী গাড়ি চালানোর অনুমোদন ছিল না। একই সঙ্গে সকালে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা পিচ্ছিল ছিল এবং অসতর্কতায় গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এর আগে রবিবার ভোর ৪টার দিকে খুলনার ফুলতলা থেকে ইমাদ পরিবহনের একটি বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। পরে ভোর ৫টা ৫ মিনিটে খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে বাসটি যাত্রী নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হয়। বাসটির চালক সকাল সাড়ে ৭টার দিকে পদ্মা সেতুর আগে এক্সপ্রেসওয়ের কুতুবপুর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে বাসটি ছিটকে পড়ে যায়। ওই ঘটনায় ১৯ জন মারা যান।

পরে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হলেন মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) পল্লব কুমার হাজরা, কমিটির সদস্য মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মনিরুজ্জামান ফকির, বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ হাসানাত-ই-রাব্বি, মাদারীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হোসেন। এ ঘটনায় শিবচর হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট জয়ন্ত সরকার বাদী হয়ে ইমাদ পরিবহন লিমিটেড কম্পানির মালিক ও সংশ্লিষ্ট সবার নামে একটি মামলা করেছেন।

খুলনা গেজেট/ এসজেড




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!