খুলনা, বাংলাদেশ | ১০ আষাঢ়, ১৪৩১ | ২৪ জুন, ২০২৪

Breaking News

  পাবনা সদর উপজেলার নতুন গোয়াইলবাড়ি এলাকায় পদ্মা নদীতে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু
  ব্লগার নাজিমুদ্দিন হত্যা : মেজর জিয়াসহ ৪ আসামির বিচার শুরু, ৫ জনকে অব্যাহতি

সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী ও কিছু কথা

শেখ দিদারুল আলম

শেখ রাজ্জাক আলী বাংলাদেশের বিশেষ করে খুলনার রাজনীতির মাঠে একটি অন্যতম নাম। তবে রাজনীতির বাইরে তিনি দেশের একজন খ্যাতনামা আইনজীবী ও সমাজসেবক। পিছিয়ে পড়া খুলনা শিক্ষাঙ্গনে তার ভূমিকা চিরদিন খুলনাবাসী মনে রাখবে। খুলনা জেলার শিক্ষা বিস্তারে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। শুধু মাত্র তার প্রতিষ্ঠিত খুলনা ‘ল’ কলেজ হতে আইনে ডিগ্রি নিয়ে শত শত পুরুষ ও মহিলা আইনজীবী বিভিন্ন বারে ভূমিকা রেখে চলছে। এই রাশ ভারী মানুষটি খুব কম কথা বলতেন। বাংলাদেশের জাতীয়তা বাদীর রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি অন্যতম ভূমিকা জাতির কাছে প্রশংসার দাবিদার। ছাত্র জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় সেই সময়কার পাকিস্তান অবজারভারে সাংবাদিকতা করেছেন। বাংলাদেশ উপজেলা সদরে দুটি আদালত আছে যেটি অন্য কোন জেলায় নেই।

সে দুটি হলো তার জন্মভূমি খুলনার পাইকগাছা উপজেলা ও কয়রা উপজেলা। তিনি ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। আমি যখন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র তখন তিনি খুলনা সুন্দরবন কলেজের সভাপতি। স্যারকে বললাম সুন্দরবন কলেজে একটা চাকরি দরকার। স্যার জানতে চাইলেন “পড় উচ্চমাধ্যমিকে এখন কিসের চাকরি “। আমি বললাম আমার না শুন্যপদে ওই বিষয়ে আমার পরিচিত কাকীমা (নাম প্রকাশ করলাম না)। স্যার বললেন, দেখা যাক। এরপর সেই কাকীমার চাকরি হয়েছিল।

স্যার স্পিকার ও আইন প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বিটিভিতে থাকার কারণে তার সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। আমরা যারা তার সাথে যেতাম আমাদের গাড়ি ঠিক আছে কিনা, ঠিক মত খেয়েছি কিনা খবর নিতেন।

স্যার যখন স্পিনার তখন আমি খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সুবাদে খুলনা প্রেসক্লাবের উন্নয়নে তার দায়িত্ববোধ আমাকে ও ক্লাব সদস্যদের মুগ্ধ করেছে।

একই সময় আমি খুলনা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের প্রভাষক। আমিসহ আমার কয়েকজন সহকর্মী খুলনা সার্কট হাউসে এক নম্বর ভিআইপি লাউঞ্জে স্যারের সঙ্গে দেখা করে শিক্ষকদের কলেজের অংশে বেতন না পাওয়ার কথা বললে নিজস্ব তহবিল থেকে দু’মাসের বেতনের ব্যবস্থা করে দেন।

১৯২৮ সালের ২৮ আগস্ট তৎকালীন ভারতের অন্তর্গত খুলনার পাইকগাছা উপজেলার হিতামপুর গ্রামে এক ব্যবসায়িক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ৭ জুন ২০১৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।

শিক্ষাজীবন

শেখ রাজ্জাক আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে অর্থনীতিতে ও ১৯৫৪ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর এখান থেকেই এলএলবি সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবন

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি ১৯৫৮ সালে খুলনা জেলা জজকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্ট বারের সদস্য এবং ১৯৬৪ সালে খুলনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি খুলনা ল’কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন উপাধ্যক্ষ এবং পরবর্তীতে ২৫ বছর এ অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান

১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও ভারতের টেট্রা ক্যাম্পে গিয়ে রেডক্রসে যোগ দিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেন।

রাজনৈতিক জীবন

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় সক্রিয়ভাবে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে যোগ দিলেও রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে; এরপর তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এ যোগ দেন এবং ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনে জাসদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত জাগদল-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন এবং ১৯৭৯ সালে এই দলের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) করা হলে সে বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ আসন থেকে সদস্য নির্বাচিত হন। একই দল থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও তিনি খুলনা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি আইন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান; পরে এ বছরের ৫ এপ্রিল ডেপুটি স্পিকার ও ১২ অক্টোবর স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে শ্রীলঙ্কার কলোম্বোতে অনুষ্ঠিত প্রথম সার্ক স্পিকার্স সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন ও সার্ক স্পিকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তার সভাপতিত্বেই জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনি ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের কয়েক দিন আগে ২০০৬ সালে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এরপর তিনি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ গঠিত এলডিপিতে যোগ দেন ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে এবং পরবর্তীকালে কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে এলডিপি ভেঙে গেলে তিনি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

সমাজ সংস্কারক সম্পাদনা

শেখ রাজ্জাক আলী সিটি ল’কলেজ, খুলনা; সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়, খুলনা; সবুরন্নেসা মহিলা কলেজ, খুলনা; বয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খুলনা; টুটপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খুলনা; পাইকগাছা ডিগ্রি কলেজ, খুলনা; শহীদ জিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাইকগাছা, খুলনা; বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল, শিরোমণি, খুলনা; সিটি ল’কলেজ মসজিদ, খুলনা; হিতামপুর জামে মসজিদ, খুলনা এবং শাহ্ জাফর আউলিয়া মাজার সংলগ্ন মসজিদ, কপিলমুনি, খুলনার প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়াও তিনি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ, খুলনা; খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; খুলনা মেডিকেল কলেজ; খুলনা মহিলা আলিয়া মাদ্রাসা ও হাজী ফয়েজউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বয়রা, খুলনা’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

শেখ রাজ্জাক আলী ছিলেন Bangladesh Legal Aid and Services Trust (BLAST)-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি।

পারিবারিক জীবন

শেখ রাজ্জাক আলী ১৯৫৩ সালে অধ্যাপক বেগম মাজেদা আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের পাঁচ মেয়ে-সন্তান; বড় মেয়ে ড. রানা রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, দ্বিতীয় মেয়ে সাহানা রাজ্জাক স্ত্রীরোগ (গাইনি) বিশেষজ্ঞ হিসেবে খুলনায় কর্মরত, তৃতীয় মেয়ে অ্যানা রাজ্জাক মেডিসিন ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ হিসাবে জার্মানিতে কর্মরত, চতুর্থ মেয়ে লীনা রাজ্জাক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং কনিষ্ঠ মেয়ে ব্যারিস্টার ড. জনা রাজ্জাক ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের আইন বিভাগের অধ্যাপক।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, খুলনা গেজেট। সাংবাদিক, অধ্যাপক ও আইনজীবী।




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!