খুলনা, বাংলাদেশ | ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ | ৬ ডিসেম্বর, ২০২২

Breaking News

  ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে তাকসিম এ খানের নিয়োগ বৈধ কি না, আদেশ মঙ্গলবার

সমাজসেবাকে ইবাদততুল্য মনে করতেন মরহুম হাজী শেখ আবদুর রশীদ

শেখ দিদারুল আলম

একজন মনীষীর কথা দিয়ে শুরু করি।” দেশ আমাকে কি দিল সেটা বড় কথা নয়। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বাস করছি, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছি এবং ব্যবসা বা চাকরি করছি এটাই বড় কথা। সুতরাং এখন আমার দেশকে দেওয়ার পালা অথবা বলা যায় আমি দেশের মা ও মাটিকে কি দিলাম সেটি বিবেকের কাছে আমার প্রশ্ন।”  এই মূলমন্ত্রকে মাথায় রেখে কোন মানুষ নীরবে নিভৃতে কাজ করে যায় সমাজে? রাজনীতি থেকে দূরে থেকেও তারা সমাজকে দেয় অকাতরে আর সমাজ বিনির্মাণে তাদের অবদান অগ্রগণ্য। এমন একজন মহৎ ব্যক্তি মরহুম হাজী শেখ আব্দুর রশিদ।

প্রচারবিমুখ মানুষটি সমাজের কল্যাণে আজীবন কাজ করে গেছেন। অবিভক্ত বাংলার হাওড়া জেলার আমতা থানায় ১৯৪৩ সালের ৮ জুন হাজী শেখ আব্দুর রশিদ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম শেখ আব্দুল মোতালেব। পাক-ভারত বিভক্তির পর হাজী শেখ আব্দুর রশিদের চাচা মরহুম শেখ ইসরাইল হোসেন পশ্চিমবাংলা থেকে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) বাংলাদেশে চলে আসেন। তারই হাত ধরে ১৯৬৬ সালে হাজী শেখ আবদুর রশীদ ও তার পরিবারের অন্যরা বাংলাদেশের, খুলনা, বানরগাতি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। হাজী শেখ আবদুর রশিদ ভারতের পশ্চিম বাংলায় থাকাকালীন কলকাতার ইংরেজদের দ্বারা পরিচালিত একটি অটোমোবাইল কোম্পানিতে ২২৫ রুপি বেতনে চাকরি করতেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে আসার পর আর চাকরি করেননি বরং নিজেই ব্যবসা শুরু করেন। যেহেতু তিনি অটোমোবাইল ব্যবসায় দক্ষ ছিলেন তাই তিনি স্বাধীনভাবে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।

মেধা, মনন ও সুদক্ষ পরিচালনায় তার ব্যবসা দিনে দিনে প্রচার লাভ করে। একইসাথে ধার্মিক এই ব্যক্তি সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। খুলনার সর্ববৃহৎ মাদ্রাসা – সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের ক্লাস সংকলন ও বাসস্থান সমাধানের জন্য তিনি নিজস্ব অর্থায়নে তিনতলা ভবন নির্মাণ করেন এবং মিলনায়তন নির্মাণ করেন। যেটি পরবর্তীকালে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তার নামে নামকরণ করেন। একই সাথে তিনি ছাত্রীদের জন্য বহুতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করেন। একইভাবে তার বসবাসরত এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসায়, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একদিকে যেমন পরিচালনা পরিষদে যুক্ত ছিলেন তেমনি ওই সকল প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বুদ্ধি, পরামর্শ ও অর্থ দিয়ে অবদান রাখেন।

একসময়, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ টাকার অভাবে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে অপারগ ছিল। তার একান্ত আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় এবং তার আর্থিক সহযোগিতায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে প্রায় এক দশক আগে থেকে আবারো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং তিনি নিয়মিত উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতার উৎসাহ দিতেন। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। কলেজ যখনই কোনো অনুষ্ঠানের জন্য তার কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন তিনি তা অকাতরে দান করেছেন। একইভাবে তিনি নজরুল নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার নিজস্ব জমির উপরে নির্মিত হয়েছে হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদ। করোনাকালীন সময়ে তিনি নিজে অসুস্থ থেকেও অসহায় মানুষদের মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যদি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি জীবনের শেষ দুই বছর তিনি অসুস্থ থাকলেও সামাজিক কাজ তাকে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি মনে করতেন সমাজসেবা আর অবহেলিত মানুষের উপকার করা ইবাদত এর সমতুল্য। তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখতেন তার এলাকায় কে কেমন আছে এবং রাতের অন্ধকারে তাদেরকে সহযোগিতা করতেন।

এ প্রতিবেদক তার সঙ্গে গল্লামারী মাছ বাজারে যেয়ে দেখেছেন তিনি শুধু বাজার করতেন না, অন্য অসহায় মানুষকে মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দিতেন। হাসিখুশি ওই মানুষটি খুলনার সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে পরপর দুইবার আয়কর সম্মেলন সিআইপির মর্যাদা পান। তার তিন ছেলে – শেখ ওয়াহিদুজ্জামান মিঠুন, শেখ সিদ্দিকুর রহমান আলমগীর ও এসএম শরীফ ও দুই মেয়ে – হাসিনা মমতাজ ও শাহনাজ পারভীন। তার বাবার রেখে যাওয়া পথ ধরে শেখ অহিদুজ্জামান মিঠুন ও শেখ সিদ্দিকুর রহমান আলমগীর ব্যবসার সাথে জড়িত। শেখ ওয়াহিদুজ্জামান মিঠুন এর মধ্যেই নিজেকে তরুণ শিল্পপতি ও সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদ নির্মাণ করেছেন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে এর উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষ করে কলেজের মসজিদসহ এলাকার আরো মসজিদ, বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য পানির ট্যাংক স্থাপন এবং দুস্থদের মধ্যে সেলাই মেশিন ও ভ্যান রিক্সা নিয়মিত বিতরণ করেন তিনি। মিঠুন জানান, তার বাবা তাকে সবসময় রাজনীতির বাইরে থেকে সমাজসেবায় উৎসাহ দিতেন এবং তার সহধর্মিণী মেহেজাবিন জামান ও দুই মেয়ে – আভ্রিদা বিন্তে জামান ও রাফিয়া নাজা মৌমিতার উৎসাহে তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন।

২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সমাজসেবক হাজী আব্দুর রশিদ ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত হয়েও যেমন জীবিত তেমনি তার সমাজসেবামূলক কাজগুলো জনগণের মনীকোঠায় তাকে জায়গা করে দিয়েছে। এই সাথে তার সন্তানরা বাবার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে।

লেখক : ইউএনবি’র খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি ও খুলনা গেজেট’র যুগ্ম সম্পাদক।

খুলনা গেজেট/ টি আই




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692