খুলনা, বাংলাদেশ | ৩ ভাদ্র, ১৪২৯ | ১৮ আগস্ট, ২০২২

Breaking News

  কমছে ডলারের দাম, নেমেছে ১১০ টাকার নিচে
  গাজীপুরে প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে শিক্ষক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার

সফরে বের হওয়ার পূর্ব করণীয় আদব (পর্বঃ ২৮)

মুফতি জুবায়ের হাসান

মুসলিম ব্যক্তি মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, সফর তার জীবনের এক আবশ্যকীয় ও জরুরি অবিচ্ছেদ্য বিষয়; কেননা, হজ্ব, উমরা, যুদ্ধ, জ্ঞান অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভাই-বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ- এসব ফরয ও ওয়াজিব বিষয় সফর করা ব্যতীত পালন করা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই শরীয়ত প্রবর্তক সফর এবং তার বিধিবিধান ও আদবসমূহের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; একজন আদর্শ মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্ব হল তা শিখে নেওয়া এবং সে অনুযায়ী আমল করা।

১. যুলুম করে দখল করা সম্পদ ও আমানতের অর্থ তার প্রকৃত মালিকের নিকট ফেরত দেয়া; কেননা, সফর হল মৃত্যুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকলকেই কোন একদিন আখেরাতের দিকে সফর করতে হবে, যেই সফর থেকে আর কেউ ফেরত আসবে না।

২. হালাল দ্রব্য থেকে নিজের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা এবং স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতার ন্যায় যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার উপর আবশ্যক, তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে যাওয়া বা তাদের জন্য অর্থসম্পদ রেখে যাওয়া।

৩. পরিবার-পরিজন, ভাই-বন্ধু ও নিকটাত্নীয়দের বিদায় জানানো এবং যাদেরকে বিদায় জানানো হবে, তাদের জন্য এ দুআ পাঠ করা:
أستودع الله دينك وأمانتك وخواتيم أعمالك
অর্থঃ আমি তোমাদের দ্বীন, তোমাদের আমানত ও তোমাদের শেষ আমলকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি। আর যাদেরকে বিদায় জানানো হয়, তারা মুসাফির ব্যক্তির জন্য এ বলে দুআ করবেঃ
زَوَّدَكَ اللَّهُ التَّقْوَى وَغَفَرَ ذَنْبَكَ ،وَيَسَّرَ لَكَ الْخَيْرَ حَيْثُمَا كُنْتَ
অর্থঃ আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ‘তাকওয়া’ দান করুন, তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং তুমি যেখানেই রওয়ানা কর, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে কল্যাণের দিকে পরিচালিত করেন। -জামে তিরিমিযী, হাদীস ৩৪৪৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: লুকমান হাকিম বলেন: আল্লাহ তা‘আলার কাছে যখন কোনো কিছু আমানত রাখা হয়, তখন তিনি তা হেফাজত করেন। আর কেউ সফরের ইচ্ছা করলে নবী করীম ﷺ তাকে বলতেন: আমি তোমার দ্বীন, তোমার আমানত ও তোমার শেষ আমলকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি। -জামে তিরিমিযী, হাদীস ৩৪৪৩

৪. সফরের জন্য উত্তম সঙ্গী হবে এমন তিনজন বা চারজন সাথীকে বাছাই করে তাদের সাথে সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়া; কেননা, সফরকে বলা হয়: مَخْبَرُ الرجال (ব্যক্তির পরীক্ষাগার); আর সফরকে (সফর) বলে নামকরণ করার কারণ হল, যেহেতু সফর ব্যক্তির চরিত্রকে উন্মুক্ত করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ
একাকী সফরকারী হচ্ছে একটি শয়তান, আর একত্রে দুইজন সফরকারী দু’টি শয়তান। তবে একত্রে তিনজন সফরকারীই হচ্ছে প্রকৃত কাফেলা। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৬০৭
তিনি আরও বলেন:
لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ مَا سَارَ رَاكِبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ
একাকী সফর করার মধ্যে কি কি ক্ষতি আছে সে সম্পর্কে আমি যা জানি, জনগণ যদি তা জানত, তাহলে কোনো ভ্রমণকারী রাতে একাকী ভ্রমণ করত না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৯৯৮

৫. ভ্রমণকারীগণ কর্তৃক তাদের মধ্য থেকে এমন একজনকে আমীর বা নেতা বানিয়ে নেওয়া, যিনি তাদের সাথে পরমর্শ করে তাদেরকে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন; রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: যখন তিনজন কোনো সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নিযুক্ত করে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৬০৮

৬. সফরের পূর্বে ‘ইস্তিখারা নামায’ আদায় করা; রাসূলুল্লাহ ﷺ এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন, এমনকি তিনি বিষয়টি সাহাবীদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যেমনিভাবে তিনি আল-কুরআনুল কারীমের কোনো সূরা শিক্ষা দিতেন।

৭. সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে প্রস্থানের সময় বলবে: আল্লাহর নামে বের হচ্ছি এবং তাঁর উপর ভরসা করছি। আর অসৎকাজ থেকে বেঁচে থাকা এবং সৎকাজের কারও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই অথবা আমাকে পথভ্রষ্ট করা না হয়; আমি যেন দ্বীন থেকে সরে না যাই অথবা আমাকে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়; আমি যেন কারও উপর যুলুম না করি অথবা আমার উপর যেন যুলুম করা না হয়।
যখন যানবাহনে আরোহণ করবে, তখন প্রথমে ০১ (এক) বার বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে তারপর ০৩ (তিন) বার আল্লাহু আকবার বলবে, অতঃপর এই দুআ পড়বেঃ
سبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ * وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ
অর্থঃ অতি পবিত্র ও মহান তিনি যিনি একে আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন, তা না হলে আমরা একে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলাম না। অবশ্যই আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে ফিরে যাব। —সূরা যুখরুফ ১৩-১৪
অতঃপর এই দুআ পাঠ করাঃ
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَسُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الأَرْضَ وَهَوِّنْ عَلَيْنَا السَّفَرَ
হে আল্লাহ! আপনিই (আমাদের) সফরসঙ্গী এবং পরিবারের অভিভাবক। হে আল্লাহ! সফরের কষ্ট হতে, বিপদাপদে পতিত হয়ে ফিরে আসা হতে এবং সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের উপর কুদৃষ্টি পড়া হতে আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য যমিনকে অনুকূল ও সফরকে সহজ ও আরামদায়ক করে দিন।

৮. বৃহস্পতিবার দিনের প্রথম প্রহরে সফরে বের হওয়া; রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا ‏‏‏ وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً أَوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ
হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতকে তার সকাল বেলায় বরকত দান কর; আর তিনি যখন কোনো সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করতেন, তখন তাদেরকে দিনের প্রথম প্রহরে প্রেরণ করতেন। তাছাড়া হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বৃহস্পতিবারে তাঁর সফরে বের হতেন। -আবু দাউদ, ২৬০৫, ২৬০৬

আল্লাহ তায়ালা আমল করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : হাফেজ মাওলানা মুফতি জুবায়ের হাসান ইমাম ও খতিব কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, আল মাহমুদ ফাউন্ডেশন, খুলনা।

খুলনা গেজেট/ এস আই




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692