খুলনা, বাংলাদেশ | ৯ চৈত্র, ১৪২৯ | ২৩ মার্চ, ২০২৩

Breaking News

  রোজায় ব্রয়লার মুরগির কেজি সর্বোচ্চ ১৯৫ টাকা : ভোক্তা অধিকার
  ব্যয় সংকোচনে রোজায় গণভবনে ইফতার পার্টি না করার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
  গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই দেশের উন্নয়ন ধরে রাখা গেছে : প্রধানমন্ত্রী
  চট্টগ্রাম শাহ আমানতে দুবাইফেরত যাত্রীর শরীর থেকে পৌনে ৪ কেজি সোনা উদ্ধার
  খুলনায় আজ সেহরীর শেষ সময় ৪টা ৪৩ মিনিট

সংকটে সাফল্য, দৃঢ়তার ফল

এ এম কামরুল ইসলাম

জাতিসংঘের উড়োজাহাজ ও বিভিন্ন এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের মধ্যে পার্থক্য আকাশ পাতাল। এই উড়োজাহাজের মধ্যে প্রচুর পরিমান মালামাল বহনের ব্যবস্থা থাকে। জাহাজের মাঝখানে মালামাল বোঝাই করে তার চারদিকে বেঞ্চের মতো সীটে বসার ব্যবস্থা আছে। সেই সীটে যাত্রী বসানো হয়। ভিতরে কোন এয়ারকন্ডিশন নাই। তাই প্রচণ্ড গরমে জাহাজ ভর্তি মালামালের সাথে গাদাগাদি করে যাত্রী নেওয়া হয়। মূলতঃ যুদ্ধক্ষেত্রে জরুরী মালামাল সরবরাহ ও সৈনিকদের আনা নেওয়ার  জন্য এইসব জাহাজ ব্যবহৃত হয়। নমপেন এয়ারপোর্ট থেকে সিয়ামরিয়েপ এয়ারপোর্টে নেওয়ার জন্য আমাদেরসহ অন্যান্য দেশের নবাগত শান্তিরক্ষীদের নিয়ে বিশাল উড়োজাহাজটি এক দেড় ঘন্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে গেল। জাহাজের মধ্যেই মোটামুটি আধা সিদ্ধ হয়ে ভর্তা আকারে সিয়ামরিয়েপ এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। আমাদের সাথে ফ্রান্স ও কেনিয়ার পুলিশের কয়েকজন ছিলেন। তাদের মধ্যে ফ্রান্সের কয়েকজনের চেহারা লাল হয়ে গেল। তারা নিজেদের মধ্যে তিক্ত আলোচনা করছিলেন, তা তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে অনুমান করেছিলাম। কেনিয়ার পুলিশের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিনি। আমরা ভীষণ মন খারাপ করে চুপচাপ ছিলাম।

সিয়ামরিয়েপ এয়ারপোর্টে নামার পর গাড়িতে করে আমাদের নেওয়া হলো Ambassador হোটেলে। এই হোটেলটি ছিল ঐ শহরের সবচেয়ে বড় হোটেল। কম্বোডিয়ার ঐতিহাসিক প্রদেশ হিসেবে এই হোটেলের এককালে বেশ কদর ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধের কবলে থেকে দেশটির বেহাল দশার সাথে হোটেলের চেহারার মিল খুঁজে পেলাম। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে বিলাসবহুল হোটেল অথচ ভগ্ন দশা দেখে মনটা খারাপ হলো। অবশ্য নবাগতদের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের MOVECON এর লোকজন আমাদেরকে ঐ হোটেলে রেখে পরবর্তীতে নিজের পছন্দের আবাসস্থল খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।

এই প্রদেশে পোস্টিং হওয়ার জন্য আগেই আমাদের মন খারাপ ছিল। তারপর সেখানে পৌঁছে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে মনের অবস্থা ক্রমান্বয়ে আরো খারাপ হতে লাগলো। অন্যদিকে মড়ার উপর খড়ার ঘা হিসেবে আমাদের কাঁদাতে লাগলো ড্রাইভার সমস্যা। প্রচুর পরিমানে গাড়ি পড়ে থাকলেও আমাদের কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়ায় গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল না। তবুও কর্তৃপক্ষ সদয় হয়ে আমাদের হোটেল থেকে আনা নেওয়ার জন্য কেনিয়া ও মালয়শিয়ার পুলিশদের দায়িত্ব দিলেন। আমরা অসহায়ের মতো তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়লাম। লজ্জা পেতে থাকলাম আরো বেশি।

কম্বোডিয়া জাতিসংঘ মিশনের অফিসিয়াল নাম ছিল United Nations Transitinal Authurity in Cambodia (UNTAC). সিয়ামরিয়েপ প্রদেশের UNTAC পুলিশ কমিশনার ছিলেন আয়ারল্যান্ডের পুলিশ সুপার মিঃ ডাউলিং। তিনি একটু বয়সী হলেও অত্যন্ত মিষ্টভাষী ও প্রজ্ঞাবান ছিলেন। তিনি আমাদের সকল সমস্যা অনুধাবন করে সমাধান করার যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন। কিন্তু শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গাড়ি চালানোর অনুমতি দিতে পারলেন না। কারণ( MT) Motor Transport সেকশন থেকে গাড়ি তুলতে গেলে অবশ্যই ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। কিন্তু আমাদের ১২ জনের মধ্যে কেউ ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাশ করতে না পারায় পরমুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। অবশ্য একমাত্র আমি ফেল করার ভয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিনি।

সিয়ামরিয়েপ প্রদেশের সদর দপ্তরে কয়েকদিন থাকার পর প্রত্যেক দেশের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দু’চারজনকে সদরে রেখে বাকী সকলকে বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। শুধু বাংলাদেশের ১২ জনের মধ্যে কাউকে সদরে না রেখে সকলকে জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমরা পড়লাম ডেমডেক নামক জেলায়। যেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছিল। অবশ্য ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের কিছু সদস্যকে আমাদের একই জেলায় পোস্টিং দেওয়া হলে ফ্রান্সের সদস্যরা সেখানে যোগদান করতে সরাসরি অস্বীকার করলেন। তাতে আমাদের মনে শঙ্কা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস হলো না। অবশেষে আমাদের ৮ জনকে ডেমডেক ও ৪ জনকে অন্য একটি জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

আমরা ধরে নিলাম, আমাদের যেখানে পাঠানো হচ্ছে সেখানে আমরা মারা গেলেও হেডকোয়ার্টারে  খবর আসতে অনেক সময় লাগবে। যেকোন জরুরী প্রয়োজনে হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ রাখার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

আমরা ডেমডেক পৌঁছে একটা বাসা ভাড়া করলাম। আমাদের আগে কেনিয়ার পুলিশের কয়েকজন সেখানে অবস্থান করছিলেন। তারা আমাদের বাসা খুঁজতে সাহায্য করলেন এবং বাজারঘাট চিনিয়ে দিলেন। কয়েকদিন পর ফ্রান্সের পুলিশ সদস্যগন বাধ্য হয়ে ঐ জেলায় যোগদান করলেন। তখন আমাদের সাহস কিছুটা বেড়ে গেল। ঐ জেলায় জাতিসংঘের কোন অফিস না থাকায় আমাদের কাজ ছিল খাওয়া আর ঘুমানো। অবশ্য প্রতিদিন দায়সারাভাবে একটা সিচুয়েশন রিপোর্ট পাঠাতে হতো।

এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। প্রায় প্রতিদিন দূর থেকে গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের দিন কাটতো। হঠাৎ একদিন আমাদের অতি নিকটে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। আমরা মারাত্মক ভয় পেতে লাগলাম। আমাদের বাড়ির মালিক দৌঁড়ে বাসায় এসে সাংকেতিক ভাষায় বললেন, প্রত্যেকে খাটের নিচে ঢুকে পড়েন।

আমি ছিলাম দোতালার একটি রুমে। দৌঁড়ে পাশের রুমে গেলাম। সেখানে গিয়ে কাউকে খুঁজে পেলাম না। এক এক করে উপরের সবকটি রুমে গেলাম। কিন্তু সব রুম ফাঁকা। ওদিকে গোলাগুলির শব্দ আরো নিকটবর্তী হতে লাগলো। উপায়ান্তর না দেখে দৌঁড়ে নিচে চলে গেলাম। নিচের রুমেও কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে দেখলাম সকলেই সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে আছে। সকলের অবস্থা দেখে আমি হাসি সংবরণ করতে না পেরে হোঃ হোঃ করে হেসে ফেললাম। আমার হাসিতে সবাই রাগান্বিত হলেন। আমাদের টিম লিডার জনাব নাজমুল হক সাহেব আমাকে রীতিমতো ধমক দিয়ে বললেন, হাসির কী আছে। বোকার মতো হাসছেন কেন। যেখানে পারেন আশ্রয় নেন।

আমি কিছুটা লজ্জিত ও কিছুটা শঙ্কিত হয়ে আশ্রয় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু আমার আগেই সকল নিরাপদ স্থান দখল হয়ে যাওয়ায় আমি অসহায় হয়ে পড়লাম। গোলাগুলির শব্দ আরো প্রকট হতে লাগলো। ভয়ের ঠেলায় আমার হাসি থেমে গেল। ওদিকে আমাদের বাসার মালিক আমার অসহায় অবস্থা দেখে হাত ধরে টানতে টানতে তাদের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে আমি আরো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেলাম। বাড়ির  মহিলা ও শিশুদের আতঙ্ক দেখে আমি ঘাবড়ে গেলাম। ঐ দেশে সকল বাড়ির কর্তা হন মহিলা। আমি তাদের ভাষা তখনও তেমন বুঝতাম না। তবুও ইশারা ইঙ্গিতে বুঝলাম, পলপট বাহিনী ও সরকারি সেনাদের সাথে যুদ্ধ চলছে। পলপট বাহিনী এখন তেমন শক্তিশালী নয়। অবশ্য কোন পক্ষ এখানে আসবে না। গোলাগুলি যা হবার তা জঙ্গলে ও পাহাড়ি এলাকায় হবে।

এভাবে বেশ কিছু সময় গোলাগুলির পর আস্তে আস্তে শব্দ দূরে যেতে লাগলো এবং এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের গুহাবাসের অবসান হলো। আস্তে আস্তে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেলাম। কম্বোডিয়া মিশনে এটাই ছিল আমাদের কাছাকাছি এলাকায় প্রথম গোলাগুলির ঘটনা। এই ঘটনার পর বুঝা গেল সিয়ামরিয়েপ প্রদেশে পোস্টিং পাবার পর, কেন সবাই ভয় পেয়েছিল।

ডেমডেক জেলা থেকে মাঝে মাঝে বিভিন্ন মিটিংয়ের জন্য আমাদের সিয়ামরিয়েপ হেডকোয়ার্টারে যেতে হতো। তখনো আমাদের সহায় ছিল কেনিয়ার পুলিশ। তাদের গাড়িতে করে জেলা সদর থেকে বিভাগীয় সদরে যাবার রাস্তা ছিল অত্যন্ত ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ। একদিন বিভাগীয় সদরে যাবার সময় কেনিয়ার পুলিশ সদস্যদের একজন আমাকে আইন ভঙ্গ করে গাড়ি চালানোর জন্য সুযোগ দিলেন। আমি সাহস করে গাড়ি চালালাম। আমার ড্রাইভিং দেখে সকলে বললেন, তুমি পরীক্ষা দিলে হয়তো পাশ করবে। চলো আজ হেডকোয়ার্টারে গিয়ে তোমার পরীক্ষার ব্যবস্থা করি।

তাদের কথা মতো হেডকোয়ার্টারে গিয়ে এম টি সেকশনে গেলাম, কিন্তু এম.টি.ও. সেদিন আমার পরীক্ষা নিতে রাজি হলেন না। তিনি জানালেন, কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের সবার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এক মাস পর আবার তারা পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তখন ফেল করলে তাদের আর সুযোগ দেওয়া হবে না। এম টি ও মি. হ্যারিশ ছিলেন বারবাডোসের একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি আমাকে দেখে তাঁর রেকর্ড চেক করে বললেন,

– তুমি এর আগে তোমার দেশের অন্যান্যদের সাথে পরীক্ষা দাওনি কেন?

আমি এক প্রকার চুপ থাকলাম। তিনি আমার প্রতি সদয় হয়ে বললেন, তুমি যদি আজ পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে না পারো হলে আবার একমাস অপেক্ষা করতে হবে। তারচেয়ে তুমি একটু শিখে নিয়ে তারপর যেকোন দিন এসো। আমি জানি তোমাদের ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। আমার হাতে তোমাদের জন্য গাড়ি বরাদ্দ আছে।

বিভাগীয় সদর থেকে কাজ শেষ করে জেলা সদরে ফেরার সময় দেখলাম নতুন কিছু পুলিশ আমাদের জেলায় পোস্টিং দিয়েছে। তারা সবাই ইন্দোনেশিয়ান। তাদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর তারা আমাকে আপন করে নিতে চেষ্টা করলেন। আমাদের জেলার বিপদসংকুল পরিস্থিতির কথা শুনে তারাও ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন। আমাকে পেয়ে তারা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন এবং তাদের গাড়িতে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। আমি কেনিয়ার বদলে ইন্দোনেশিয়ার গাড়িতে করে ডেমডেক ফিরে গেলাম। ওদের জন্য বাসা খুঁজতে সাহায্য করলাম এবং সাহস যোগাতে চেষ্টা করলাম। আমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে তারা আমাকে একান্ত আপন করে নিলেন। বিশেষ করে সন্ধ্যা হলেই তারা আমাকে তাদের বাসায় রাখতে চেষ্টা করতেন। আমিও দিনের বেলায় তাদের গাড়ি নিয়ে চালাতে লাগলাম।

এরমধ্যে একদিন বিভাগীয় সদরে আমাদের টীম লিডার জনাব নাজমুল হক সাহেবের জরুরী তলব পড়লো। তিনি সংকট দেখলেই আমাকে সাথে নিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সেদিনও আমাকে সাথে নিলেন। কেনিয়ার গাড়িতে করে আমরা বিভাগীয় সদরে হাজির হলাম। বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার মি. ডাউলিং জনাব নাজমুল হক সাহেবকে বললেন, আমি তো তোমাকে একা আসতে বলেছিলাম। কারণ হেলিকপ্টারে করে আমাদের অনেক দূরে একটি বিপদসংকুল এলাকায় যেতে হবে। ঐ হেলিকপ্টারে বার জনের সীট আছে। বিভিন্ন দেশের আরো অনেক সদস্য যাবেন। তবে, চলো আগে এয়ারপোর্টে যাই, তারপর দেখা যাবে।

আমরা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখলাম যাদের যাবার কথা ছিল তারা সকলেই হাজির। শুধুমাত্র ফ্রান্সের তিনজন তখনো পৌঁছায়নি। মি. ডাউলিং বললেন, ফ্রান্সের তিনজন এলে বাংলাদেশের একজনের সীট হবে। এখন বল তোমাদের দু’জনের মধ্যে কে যাবে?

তখন জনাব নাজমুল হক সাহেব আমাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করায় আমি খুশি মনে রাজি হয়ে গেলাম।

একটু পর ফ্রান্সের পুলিশ সদস্যরা এলেন। কিন্তু তারা তিনজনের পরিবর্তে দুইজন এসেছিলেন। তখন মি. ডাউলিং খুশি হয়ে আমাকে ডেকে নিলেন। কিন্তু আমি তাতে খুশি না হয়ে ভীষণ অপমানবোধ করলাম এবং হেলিকপ্টারে উঠতে ভদ্রতার সাথে অস্বীকার করলাম। জনাব নাজমুল হক সাহেবকে বাংলায় বললাম, আমরা বাংলাদেশীরা কী এতই ফেলনা। যখন লোক বেশি হয়েছিল তখন আমাকে বাদ দেয়া হলো, আর এখন লোক কম হওয়ায় আমাকে নিতে চাচ্ছেন।

আমার মনে মনে রাগ হলেও বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে মি. ডাউলিং ততটা আঁচ করতে না পেরে জনাব নাজমুল হক সাহেবের কাছে বললেন, মি. কামরুল কেন যাবে না?

জনাব নাজমুল হক সাহেব তখন আমার ক্ষোভের কথা মি. ডাউলিংকে বুঝিয়ে বললেন।

মি. ডাউলিং সব কথা শুনে বললেন, My goodness!

তারপর আমাকে বার বার অনুরোধ করলেও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলাম। শেষ পর্যন্ত আমাকে এয়ারপোর্টে রেখে সকাল দশটার দিকে হেলিকপ্টারে এক সীট খালি নিয়ে তাঁরা রওয়ানা হলেন। বিকেল পাঁচটায় তাঁদের ফিরে আসা অব্দি  এয়ারপোর্টে বসে থাকা ছাড়া আমার উপায় রইলো না।

রাগে ক্ষোভে আমি বিষন্ন মনে আখ কিনে চিবাতে চিবাতে ভাবলাম, এত সময় বসে না থেকে সদর দপ্তরে এমটিও সাহেবের কাছে গিয়ে দেখি ড্রাইভিং পরীক্ষা দেওয়া যায় কিনা।

যে কথা সেই কাজ। একটা স্থানীয় মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে সোজা এমটি সেকশনে হাজির হলাম। এমটিও মি. হ্যারিশ অফিসেই ছিলেন। তাঁকে গিয়ে আমার ড্রাইভিং পরীক্ষা নিতে অনুরোধ করলাম। তিনিও সদয় হয়ে সম্মত হলেন। আমার ভীতরে আজকের অপমান ও জেদ দ্বিগুণ শক্তি সঞ্চার করলো। আল্লাহর উপর ভরসা করে দোয়া দরুদ পড়ে ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েই পাশ করে গেলাম। মি. হ্যারিশ অত্যন্ত খুশী হয়ে আমাকে একটি নতুন পাজেরো জিপ দিয়ে বললেন, তোমাদের টীমের জন্য তুমি আশীর্বাদ। আমিও চিন্তামুক্ত হলাম।

মি. হ্যারিশকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি গাড়ি বুঝে বুঝে নিয়ে প্রথমে হোটেলে গিয়ে পেটপুরে খেয়ে বিকাল পাঁচটার আগেই এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে রইলাম।

যথাসময়ে হেলিকপ্টার ফিরে এলো। মি. ডাউলিং আমাকে দেখে বার বার দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম আল্লাহ যা করেন, তা মঙ্গলের জন্য করেন।

মি. ডাউলিং জনাব নাজমুল হক সাহেবের দিকে চেয়ে বললেন,

-তোমরা সরাসরি জেলায় চলে যাও। ইন্দোনেশিয়ার গাড়িতে করে তোমরা গেলে ভাল হবে।

আমি বললাম, না স্যার। আমার গাড়িতে আমরা দু’জন যেতে পারবো।

মি. ডাউলিং অবাক হয়ে বললেন, তোমার গাড়ি মানে!

আমি দূরে পার্কিং করা আমার পাজেরো জিপ দেখিয়ে বললাম, -ওটা আমার গাড়ি।

কিভাবে পেলে?

আমি ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাশ করায় এমটি সেকশন থেকে গাড়ি দিয়েছে, স্যার।

মি. ডাউলিং চোখ ছানাবড়া করে বললেন,

How strange!

Congratulations.

I am really happy. You are the first man of your contingent, who got the driving licence.

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার পর আমার মনোবল বেড়ে গেল। রাস্তায় যেতে যেতে জনাব নাজমুল হক সাহেব রহস্য করে আমাকে বললেন, কামরুল, আইজিপি সাহেবের ড্রাইভার একজন কনস্টেবল বা হাবিলদার। কিন্তু আমি এডিশনাল এসপি হলেও আমার ড্রাইভার একজন ইন্সপেক্টর। তাহলে আইজিপি বড়, না আমি বড়?

আমিও ঠাট্টা করে বললাম, আমি একজন গেজেটেড ড্রাইভার এবং আজ থেকে আমার বস হবেন আপনি ও আমাদের সঙ্গীয় সকল সাব ইন্সপেক্টরসহ সকলেই। এজন্য আমি গর্বিত।

নানা আলোচনার এক পর্যায়ে আমি বললাম, প্রতিটি দেশের কমপক্ষে দু’জন সদস্য হেডকোয়ার্টারে রেখে বাকিদের জেলায় পোস্টিং দিয়েছে, কিন্তু আমাদের কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়ায় এতদিন আমরা সবাই জেলায় জেলায় পড়ে আছি। চলুন, আজকে আমরা হেডকোয়ার্টারে গিয়ে মি. ডাউলিং সাহেবের কাছে আমাদের কথা বলি।

জনাব নাজমুল হক সাহেব বরাবর একটু বেশী ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি আমার প্রস্তাবে আমতাআমতা করলেও শেষ পর্যন্ত আমার কথায় রাজি হলেন। তবে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না বলে জানালেন। আমাকেই সবকিছু বলতে হবে।

আমি বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর কথায় সম্মত হয়ে সোজা মি. ডাউলিং এর অফিসে হাজির হলাম। আমদের দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, Any problem?

 I told you to go back to your district but,,,,,,,,,,

জনাব নাজমুল হক সাহেব আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, He wants to talk with you.

মি. ডাউলিং ও আমরা সবাই ছিলাম ক্লান্ত। তাই বেশি সময় না নিয়ে আমি সরাসরি বললাম, Excuse me sir. We are serving here under your command. But nobody of us at the provincial headquarters. We don’t feel safe in the district without our representatives in the headquarters.

-Yes, I know. But no one of you have got driving licence. So, how do you perform your duty here without driving?

You got your driving permit today. So, I may posted you here from today. Are you agree?

-Yes, I am.

-Think it twice. Tomorrow morning at 5.00 hrs your duty will be with Malaysian and Nigerian. Make ready yourself.

-Okay sir.

আমার দৃঢ়তা দেখে জনাব নাজমুল হক সাহেব খুশি হলেন এবং ফ্রান্সের লোকজনের সাথে তিনি জেলায় ফিরে গেলেন। আমি একা মি. ডাউলিং এর সামনে বসে ভাবতে লাগলাম, এখানে আমার সাথে একজনও বাংলাদেশি নেই। কোথায় থাকবো, কোথায় খাবো, কার সাথে কথা বলবো।

আমার মানসিক অবস্থা টের পেয়ে মি. ডাউলিং পাশের রুমে গিয়ে মালয়েশিয়ার একজন অফিসারকে ডেকে আনলেন। তাঁর নাম ছিল মি. মুনানদাই। তাঁকে মি. ডাউলিং বললেন

-Mr. Kamrul of Bangladesh has been posted here today. May you arrange his residence nearby your house?

মি. মুনানদাই বললেন, It is about evening. He may stay with me tonight at our residence. We will try for him tomorrow.

তারপর তিনি আমার হাত ধরে তাঁর গাড়িতে করে তাঁদের বাসায় নিয়ে গেলেন।

আনন্দ

আমাদের ১২ জনের মধ্যে একমাত্র আমি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ায় মনটা খুশিতে ভরে গেল।

নিজে যোগ্যতা অর্জন করার সুখ অনেক বেশি।

আমি আমাদের সকলের প্রতিনিধি হিসেবে হেডকোয়ার্টারে পোস্টিং পাওয়ায় কিছুটা গর্বিত হলাম।

বেদনা

আমাদের দলের সকলকে ফেলে একাকী হেডকোয়ার্টারে থাকা মনোকষ্টের ছিল। তাছাড়া বিদেশের মাটিতে বাংলায় কথা বলার মতো আমার আশেপাশে কেউ রইলো না। চলবে…

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ পরিবার। (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, অব.)




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!