খুলনা, বাংলাদেশ | ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ | ২৬ মে, ২০২৪

Breaking News

  ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে ‘রেমাল’, মোংলা-পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত
  উপকূলীয় এলাকায় লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশ

‘মৌলভী ভাই’ গিরিশচন্দ্র সেনের কোরান শরীফ বঙ্গানুবাদ ও কিছু কথা

এ এম কামরুল ইসলাম

‘মৌলভী ভাই’ গিরিশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৫ খ্রিঃ, মৃত্যু ১৯১০ খ্রিঃ। বৃহত্তর ঢাকা জেলার মহেশ্বরদি (তৎকালীন) পরগনার পাঁচদোনা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। নবাব আলীবর্দি খাঁর দেওয়ান দর্পনারায়ণ রায়ের বংশে তাঁর জন্ম। পারস্য ভাষার সুলেখক হিসেবে এই বংশের সুনাম ছিল।

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তৎকালীন প্রায় তিন কোটি বাঙালি মুসলমানদের জন্য পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদের কথা তেমন কেউ চিন্তা করতে পারেননি। অবশ্য তখনো বাংলা ভাষায় মোটামুটি যথেষ্ট পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। আরবি ফার্সী ভাষায় পন্ডিত অনেক মুসলমানও তখন ছিলেন। আরবি জানা সেইসব মুসলমান পন্ডিতগণ বাংলা ভাষাতেও পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদ করার মতো মনোযোগ কারো ছিল না। এই গুরুভার বহন করার জন্য সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসেন একজন হিন্দু সন্তান। বিধান-আচার্য কেশবচন্দ্রের নির্দেশে গিরিশচন্দ্র সেন এই মহান দায়িত্ব সম্পাদন করে ইতিহাসের পাতায় ‘মৌলভী ভাই’ গিরিশচন্দ্র সেন হিসেবে সমগ্র বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় চির সমুজ্জল হয়ে আছেন।

শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক অসিতবরণ ঘোষ তাঁর প্রয়াণের প্রায় বছর দু’য়েক আগে মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাংলায় অনুদিত সেই পবিত্র কোরানের একটি কপি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমিও তাঁর চাহিদা মোতাবেক তাঁকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন অনুদিত এক কপি বাংলা কোরান শরীফ উপহার দিয়ে নিজেকে ধন্য করেছিলাম।

শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক অসিতবরণ ঘোষ স্যারের কাছ থেকে এই মহামূল্যবান উপহার পেয়ে মাঝে মা‌ঝে তা পাঠ করার চেষ্টা করি এবং আমার সংগৃহীত আরো অন্যান্য বাংলা কোরান শরীফের সাথে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। অধ্যাপক অসিতবরণ ঘোষ স্যার এই পবিত্র কোরানের আদ্যোপান্ত পড়তেন তা বুঝতে আমার তেমন বেগ পেতে হয় না। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুঁজে বের করতে কষ্ট করা লাগে না। কারণ অধ্যাপক অসিতবরণ ঘোষ স্যার এই গ্রন্থ পাঠ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ অংশ মার্ক করে রেখেছিলেন।

মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ পড়ে আমি অন্যান্য অনুবাদের সাথে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে বুঝি- তিনি আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে যে অনুবাদ করেছিলেন তা ছিল অবিস্মরণীয়। তাইতো সেই আমলে মুসলমান পন্ডিতগণ ও হিন্দু ধর্মের পন্ডিতগণ পবিত্র কোরানের এই বাংলা অনুবাদকে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং মহাবীর গিরিশচন্দ্র সেনের নামের সাথে ‘মৌলভী ভাই’ জুড়ে দিয়েছিলেন।

তাঁর অনুদিত কোরান অত্যন্ত সহজবোধ্য এবং প্রতিটি ঘটনার পিছনে আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্ত ফুট নোট হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। আমি বিভিন্ন বাংলা কোরান শরীফ পড়ে মাঝে মাঝে বুঝতে ভুল করলেও অতি সহজে মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ বুঝতে পারি।

আজকাল অনেকে মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ নিয়ে সমালোচনা করে থাকেন এবং প্রকারান্তরে এটাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার মতে এটা একজন গুণী মানুষের অবমাননার সামিল। তৎকালীন মুসলমান আলেম ও হিন্দু পন্ডিতগণের কিছু কিছু মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন তখনকার মুসলমান ও হিন্দু পন্ডিতের কাছে কতটা শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, কোন বিশেষ কারণে মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদ প্রকাশের সময় লেখক ও অনুবাদক হিসেবে তাঁর নাম পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। পরবর্তীতে মুসলমান পন্ডিতগণ তাঁর অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁকে চিঠি লিখলেও চিঠিতে প্রাপকের কোন নাম ঠিকানা উল্লেখ ছিল না।

আমার কাছে যে সংস্করণ সংগৃহীত আছে তা অনেক পরের অর্থাৎ ১৩৮৬ বঙ্গাব্দের প্রকাশনা। এই সংস্করণের সম্মানিত প্রকাশক ‘প্রকাশকের নিবেদন’ হিসেবে যা লিখেছিলেন তার ছবি এখানে পেস্ট করলাম, যাতে পাঠকের সংশয় দূর হবে।

মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন তাঁর এই অনুবাদে ছয় পৃষ্ঠার একটা ভূমিকা লিখেছিলেন। পাঠকের সুবিধার্থে তার তিনটি অংশের ছবি তুলে এখানে পেস্ট করা হলো।

শ্রীসতীকুমার চট্টোপাধ্যায় মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে এক পর্যায়ে মৌলভী ভাইয়ের একটি ছোট উক্তি তুলে ধরেছেন-

“মোসলমান জাতির মূল ধর্মশাস্ত্র কোরাআন শরীফ পাঠ করিয়া এস্ লাম ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য আমি ১৮৭৬ খৃঃ লক্ষৌনু নগরে আরোব্য ভাষা চর্চা করিতে গিয়াছিলাম”।

মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেন বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে লিখতে লিখতে এক সময় তাঁর ডানহাত পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেলে বাম হাতে লেখা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি লিখেছিলেন-

“পরলোকগত মহাপুরুষদিগের জীবনচরিত আলোচনা ব্যতীত তাঁহাদের জীবনের গূঢ় তত্ত্ব ও মাহাত্ম্য অবগত হওয়ার অন্য উপায় নাই। সহস্র সহস্র বৎসর গত হইল, তাঁহারা পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছেন, তথাপি জীবনচরিতের ভিতর দিয়াই তাঁহারা স্ব স্ব জীবনের আলোক বিকীর্ণ করিয়া নরনারীর আত্মাকে আলোকিত করিয়াছেন”।

“পশ্চিম এশিয়া মহাতেজস্বী পুরুষরত্ন মহাপুরুষদিগের আকর। তুরস্ক ও আরবভূমিতে কিয়ৎকাল অন্তর এক এক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়া সূর্যের ন্যায় দীপ্তি প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। পৃথিবীর অন্য কোন প্রদেশে এত অধিক জ্যোতিষ্মান ধর্মপ্রবর্তক পুরুষের আবির্ভাব হয় নাই”।

তিনি ‘ধর্মতত্ত্ব’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
শেষ জীবনে তিনি তাঁর জন্মভূমি ঢাকায় বসবাস করার ইচ্ছে পোষণ করেন। ঢাকায় আসার পর তাঁর আত্মীয়স্বজনরা তাঁর সেবাযত্ন করেন। সাথে সাথে হিন্দু-মুসলমান একত্রিত হয়ে তাঁর পরিচর্যা করেন। অবশেষে বিধির বিধান অনুযায়ী ১৫ আগস্ট, ১৯১০ খ্রিঃ তিনি দেহত্যাগ করেন। তখন হিন্দু মুসলমান একত্রিত হয়ে তাঁর মরদেহ দাহ করেন।

জনৈক মুসলমান বন্ধু মোলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের মৃত্যুর সংবাদ শুনে ‘নববিধান প্রচারাশ্রমে’ একটি চিঠিতে লিখেনঃ

“আজ বঙ্গীয় মুসলমানদিগের একজন সুহৃদ তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া অনন্তধামে চলিয়া গিয়াছেন। হায়! কে আর এখন আরব্য ও পারস্য ভাষা হইতে উৎকৃষ্ট ও উপাদেয় গ্রন্থ বঙ্গভাষায় অনুদিত করিয়া মুসলমানদিগকে ইসলামের বিষয় শিক্ষা দিবে”?

আমি নিজে ধর্মীয় বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। তবে সুযোগ পেলে পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদ পড়ার চেষ্টা করি। এই উদ্দেশ্য আমার সংগ্রহে বিভিন্ন প্রকাশনীর একাধিক অনুবাদ রয়েছে। ইসলামি ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে, সৌদি বাদশা কর্তৃক অনুদিত কোরান এবং সর্বশেষ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন অনুদিত কোরান সংগ্রহ করেছি। সেগুলো মাঝে মাঝে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদের সাথে সাংঘর্ষিক কোনকিছুই পাইনি।

পবিত্র কোরানের পাশাপাশি বিভিন্ন হাদিস ও বিভিন্ন আলেম ওলামার লেখা ইসলাম ধর্মীয় বই পড়ার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে বিভিন্ন মিডিয়ায় ইসলামের আলোচনা শুনি। এমনকি সরাসরি ওয়াজ নছিহত শুনি। এইসব শুনে ও পড়ে আমি মাঝে মধ্যে বিভ্রান্ত হই। আমার মনে হয়, আমার মতো অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে থাকেন। বিশেষ করে আজকাল শব্দ যন্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এবং সংশ্লিষ্ট বক্তা গলা ফাটিয়ে হুংকার দিয়ে দিয়ে যখন ধর্মের কথাগুলো তার নিজের মতো করে জাহির করেন তখন ধর্ম প্রচারের চেয়ে ধর্মের অবমাননা বেশি হয় বলে আমার বিশ্বাস। সাথে সাথে নিজের ইচ্ছেমতো ধর্মের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অন্য ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করে স্ব স্ব ধর্মের অবমাননা করেন। আমি কোনদিন ইসলাম ধর্মের কোন আলেমকে মৌলবী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের কোরানের অনুবাদ নিয়ে প্রশংসা করতে শুনিনি। এমনকি হিন্দু ধর্মের আলোচনা সভায় এই মহান মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুনিনি। বরং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মুসলমান সংখ্যালঘু হওয়ায় সেখানে ইসলাম ধর্ম নিয়ে মারাত্মক কটাক্ষ করা হয়।

আমি জানিনা কবে এই অঞ্চলের হিন্দু মুসলমান একত্রিত হয়ে মৌলভী ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অসাম্প্রদা‌য়িক আদর্শ বুকে ধারণ করবে, আর কবে আমরা ধর্মীয় হানাহানি বাদ দিয়ে প্রকৃত মানুষ হবো।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ পরিবার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, অব.)।

খুলনা গেজেট/এমএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!