খুলনা, বাংলাদেশ | ১০ বৈশাখ, ১৪৩১ | ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

Breaking News

মুক্তিযুদ্ধে খুলনার কমার্স কলেজ

কাজী মোতাহার রহমান

পাকিস্তান জামানায় ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। এ অভূতপূর্ব বিজয়ের পর জয়ী দল একাত্তরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শুভ মুহুর্ত গুণতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বাঙালি জাতির এ বিজয় মেনে নিতে পারেনি। পর্দার আড়ালে শুরু হয় ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জে. আগা ইয়াহিয়া খান একাত্তরের ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আহবান করেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়, একাত্তরের ১ মার্চ। সকাল থেকে খুলনা শহরে ইথারে ইথারে খবর ভেসে আসে পাক প্রেসিডেন্ট রেডিও এবং টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। দুপুর ১ টা নাগাদ প্রেসিডেন্টের ভাষণের পরিবর্তে রেডিওতে জাতীয় সংসদের ৩ মার্চ এর অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা প্রচারিত হয়। রেডিওতে এ ঘোষণার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র- জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। স্বোচ্চার কন্ঠে সেদিন ছাত্র-জনতার শ্লোগান ছিল “জয়বাংলা”, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা- যমুনা”, “ছয় দফা না এক দফা, স্বাধীনতা স্বাধীনতা” এবং “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর”।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে শহরের স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রাবাস ছেড়ে শিক্ষার্থীদের একাংশ গ্রামে ফিরে যায়। শিক্ষাঙ্গণের পাশের মেসে স্বাধীনতা প্রত্যাশী ছাত্ররা অবস্থান করে। তখনকার দিনে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মেডিকেল কলেজ ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারি বি এল কলেজ, খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, আযম খান কমার্স কলেজ, দৌলতপুর দিবা-নৈশ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়, সিটি কলেজ, সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয় ও সিটি ল’ কলেজ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে মার্চের প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য শহরের দেয়াল লিখনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শহরের আহসান আহমেদ রোডস্থ টিএন্ডটি অফিসের (অধুনালুপ্ত) সামনে, পিকচার প্যালেস মোড়, নগর ভবন ও তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, খুলনার প্রধান গেটের কাছে গভীর রাতে দেয়াল লিখন হয়। দেয়াল লিখনের ভাষাটি ছিল “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর”।

গভীর রাতের দেওয়াল লিখনের নেতৃত্ব দেন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী শেখ আব্দুল কাইয়ুম। এতে অংশ নেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সুশান্ত কুমার নন্দী, আব্দুস সবুর, ইউসুফ আলী ভূঁইয়া, তালুকদার আব্দুল খালেক, আ ব ম নুরুল আলম, নুরুল ইসলাম খোকন ও শামসুদ্দোহা টিপু।

মার্চ সরকারি বি এল কলেজে বি এ অনার্স পরীক্ষা চলছিল। কলেজের অধ্যক্ষ এম বি চৌধুরী সে দিন বেতারের ঘোষণা এবং সংসদ অধিবেশন স্থগিতের খবর পরীক্ষার্থীদের অবহিত করেন। বি এল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি স. ম. বাবর আলী (১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য) এর নেতৃত্বে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে। তারা কলেজ অঙ্গণ থেকে জঙ্গি মিছিল বের করে। বিকেলে ছাত্রলীগের উদ্যোগে আযম খান কমার্স কলেজ থেকে জঙ্গি মিছিল হাদিস পার্কের উদ্দেশ্যে বের হয়। সে সময় শহরের বেসরকারি কলেজের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া এ কলেজ মূল শহরে অবস্থিত হওয়ায় ছাত্র রাজনীতির প্রাণ কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। ২ মার্চ এ কলেজ প্রাঙ্গন থেকে স্বাধীনতার দাবিতে ছাত্রলীগের একটি জঙ্গি মিছিল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে এ কলেজ ছাত্র সংসদে ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ছাত্রলীগ নেতা শাহনেওয়াজ জামান চৌধুরী আজাদ ও জিএস আফজাল হোসেন।

এ কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন হচ্ছেন মরহুম জাহিদুর রহমান জাহিদ, বিনয় ভূষণ চ্যাটার্জী, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত কুমার নন্দী, যুগ্ম সম্পাদক শেখ আব্দুল কাইয়ুম, সৈয়দ মনোয়ার আলী, মোঃ কায়কোবাদ আলী, স ম আব্দুস সাত্তার, আব্দুস সবুর, শাহ আবুল কাশেম, শাহ আবুল কালাম, এস. এম দাউদ আলী, ফেরদৌস আলম, গোলাম রসুল, কুদরুত ই এলাহী, মিজানুর রহমান, মোঃ সোবহান গোলদার, টি এম নিজানুল হক, রুহুল আমিন, মোঃ আবু জাফর, শেখ জামসেদ হোসেন, লাল প্রমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন নারায়ণ চন্দ্র (পরবর্তীতে অধ্যক্ষ), রনজিৎ দত্ত, মোঃ লিয়াকত আলী মিনা, এম আব্দুল্লাহ (পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের ধর্মমন্ত্রী), আব্দুল মজিদ মল্লিক,আমিনুল হক, সাদিক পল্টু ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)-এর হারণ-অর-রশীদ।

মুসলিম লীগ সমর্থিত ছাত্র সংগঠন এনএসএফ- এর রাজনীতির সাথে যুক্তরা হচ্ছেন মাসুদুর রহমান ও কামাল হোসেন। একাত্তরে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোঃ আবুল বাশার। তিনি কুমিল্লা জেলার অধিবাসী। কলেজ অঙ্গণে অধ্যক্ষের বাসভবনে অবস্থান করতেন। পরোক্ষভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ছয় দফার আগে ছাত্রলীগকে সমর্থন করলেও ৬৮ সাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির বিরোধিতা করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী কলেজে অধ্যক্ষ পদে তার যোগদান নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ বারীর (৭৩ সালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য) সহযোগিতায় তিনি স্ব পদে বহাল হন।

কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ আনোয়ার হোসেন আনু।

হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর এস এ হাসিব (১৯৬৩-১৯৯৭ পর্যন্ত দায়িত্বকাল) এর বর্ণনা মতে, বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক হারুণ অর রশীদ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তিনি তেরখাদা উপজেলার অধিবাসী। জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাওলানা এ কে এম ইউসুফের তত্ত্বাবধায়নে খুলনায় রাজাকার ক্যাম্প গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন। শিক্ষকতা থেকে অবসরের পর তিনি আইন পেশায় যোগ দেন। এ কলেজের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক এ বি এম রশীদুজ্জামান ও ভূগোল বিভাগের প্রভাষক জি এম মহিউদ্দিন পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেন।

৩ মার্চ স্বাধীনতার দাবিতে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল পার্ক (আজকের শহীদ হাদিস পার্ক) থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জঙ্গি মিছিল বের হয়। লোয়ার যশোর রোডস্থ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে বেলুচ পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে সত জন শহীদ হয়। মিছিলের নেতৃত্ব দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আব্দুল আজিজ, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান খান, জাতীয় পরিষদ সদস্য সালাহউদ্দিন ইউসুফ, এম এ গফুর, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এ্যাড. মোমিন উদ্দিন আহমেদ, এ্যাড.মোহাম্মদ এনায়েত আলী, জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু প্রমুখ। ছাত্র-জনতার কাছে স্পষ্ট হয় সশস্ত্র যুদ্ধর মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। ফলে ছাত্র-জনতা অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ৩ মার্চ বিকেলে ছাত্র সমাজ খুলনা শহরের কালী বাড়ি রোড ও কে ডি ঘোষ রোডস্থ কয়েকটি বন্দুকের দোকান লুটের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করে। এতে কমার্স কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শেখ কামরুজ্জামান টুকু, বি কম শেষ বর্ষের ছাত্র সুশান্ত কুমার নন্দী, শেখ কাইয়ুম প্রমুখ অংশ নেন।

৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠিত হয়। ছাত্রলীগের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে এখানে আহবায়ক মনোনীত করা সম্ভব হয়নি। বি এল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি স. ম. বাবর আলী ও হুমায়ুন কবির বালুকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়। এ কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন শেখ আব্দুল কাইয়ুম, ইস্কান্দার কবীর বাচ্চু, শেখ শহীদুল হক, হায়দার গাজী সালাউদ্দিন রুনু, হেকমত আলী ভূঁইয়া, আবুল কাশেম (পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার), ফ. ম. সিরাজ, মাহাবুবুল আলম হিরণ, শেখ শওকত আলী ও মিজানুর রহমান। ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে “জয় বাংলা” বাহিনী গঠন করা হয়। জয় বাংলা বাহিনী, খুলনার প্রধান ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক শেখ আব্দুল কাইয়ুম। এ বাহিনী জিলা স্কুল মাঠে প্রতিদিন বিকেলে স্কুলের ক্যাডেটদের ডামী রাইফেল নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে প্রশিক্ষণ শুরু করে।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন, ইউসুফ আলী ভূঁইয়া, আব্দুস সবুর, নূরুল ইসলাম খোকন, শামসুদ্দোহা টিপু, সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ। জয় বাংলা বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় জিলা স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণের সময় ব্যাপক সাড়া পায়। ২৩ মার্চ সকাল ১০ টায় সাদা পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে জয় বাংলা বাহিনী মিউনিসিপাল পার্কে উপস্থিত হয়। এ বাহিনীর প্রধান শেখ আব্দুল কাইয়ুম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। খুলনায় এই প্রথম পতাকা উত্তোলন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

পাকিস্তানী বাহিনী প্রথমে সার্কিট হাউসে পর্যায়ক্রমে নূরনগর, শিপইয়ার্ড, পিএমজি,রুজভেল্ট জেটি, খালিশপুর পিপলস মিল, আজকের অফিসার্স ক্লাব ও গল্লামারীস্থ বেতার কেন্দ্রে সেনা ছাউনী ফেলে।

এখানে পাকবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন ২২ এফ রেজিমেন্টের লেঃ কর্ণেল শামস। তার নেতৃত্বে স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের তালিকা এবং হত্যার নীল নকশা তৈরি হয়। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানী সেনারা অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করলে যশোর ও জাহানাবাদ (খুলনার ফুলতলা) সেনানিবাস থেকে পাঞ্জাবী সৈন্যরা ব্যারাক ছেড়ে বাইরে আসতে থাকে। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী খুলনা জেলা প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে কয়েক জন জীপ যোগে টহল দেয়ার সময় ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা তাদেরকে ঢাকায় গণহত্যার খবর জানায়। এ খবর পাওয়ার পর শহরের রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক স্থানীয় ছাত্র যুবকরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

২৬ মার্চ খানজাহান আলী রোডস্থ কবীর মঞ্জিলে (আলিয়া মাদ্রাসার অদূরে) এক বৈঠকে বিপ্লবী পরিষদের কমিটি গঠন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় এ পরিষদ ই খুলনা জেলায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে। কমিটির চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু, সদস্যবৃন্দ কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা এ্যাড. কেএস জামান, বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি স. ম. বাবর আলী, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ আব্দুল কাইয়ুম ও ডাঃ আশিকুর রহমান।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয়, ১৯৬৪ সালে এ প্রতিষ্ঠানে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন শেখ কামরুজ্জামান টুকু। এখান থেকেই তিনি ন্সাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক ও ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ৭১ সালের মে মাসে ছাত্রলীগের কর্মীদের মুজিববাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে ভারতের হাফলং ও দেরাদুনে প্রশিক্ষণে পাঠান। তিনি বৃহত্তর খুলনা মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে খুলনা অঞ্চলে ৮০টি ক্যাম্পের নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ জনপদে এ বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা কমার্স কলেজের গর্ব। এ প্রতিষ্ঠানের আরও একজন গর্বিত শিক্ষার্থী শেখ আব্দুল কাইউম। তিনি ১৯৬৯-১৯৭১ পর্যন্ত খুলনা জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ৭১’র মার্চে জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান হিসেবে ছাত্রলীগের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন। খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পের পতনের পর যুদ্ধাপরাধীদের মৃর্তুদ- কার্যকর করেন। ১৯৭৪ সালে খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। হাদিস পার্কে দূর্জয়-৭১ নামক ভাস্কর্যের উদ্যোক্তা।

গল্লামারী যুদ্ধের অধিনায়ক শহীদ সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদিন।

পাক বাহিনী ২৬ মার্চ সকাল থেকে খুলনা শহরে কনভয় যোগে শহরে টহল দিতে শুরু করলে বিপ্লবী পরিষদের সদরদপ্তর খানজাহান আলী রোড থেকে পূর্ব রূপসায় স্থানান্তর করা হয়। রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে রেলষ্টেশনের কাছে জাহানারা মঞ্জিলে বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান অবস্থান নেন। এখানেই গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প, এটাই জেলার প্রথম ক্যাম্প। জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান ও বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু ক্যাম্প পরিচালনা করতেন। এ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ৪ এপ্রিল গল্লামারীস্থ রেডিও পাকিস্তান, খুলনা কেন্দ্র দখলের জন্য যুদ্ধ করে। যুদ্ধের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু। অসহযোগ আন্দোলনের আগ থেকে রেডিও সেন্টারে পাকবাহিনী সেনা ছাউনী ফেলে। গল্লামারী যুদ্ধের অধিনায়ক সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদন, মোসলেন ও হাবিব শহীদ হন।

গল্লামারীস্থ বেতার কেন্দ্র দখলের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যায়। ভারতের হাফলং ও দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর (দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল) অধিনায়ক তোফায়েল আহমেদের তত্বাবধায়নে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। শত্রু সেনাদের পরাজিত করার জন্য পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে যুদ্ধে অংশ নেয়। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা মুজিব বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন, বৃহত্তর খুলনা মুজিব বাহিনী প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ (১৯৭৩ সালে খুলনা পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান), ডেপুটি কমান্ডার শেখ আব্দুস সালাম, জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান শেখ আব্দুল কাইউম, কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শাহানেওয়াজ জামান চৌধুরী আজাদ, টিএম নিজানুল হক, মোঃ মনিরুজ্জামান মনি (পরবর্তীতে মেয়র, খুলনা সিটি কর্পোরেশন), মোঃ আব্দুল হালিম, মোঃ আবু জাফর, স.ম. আব্দুস সাত্তার, মোঃ কায়কোবাদ আলী, মোঃ আব্দুল্লাহ (শেখ হাসিনা সরকারের ধর্ম মন্ত্রী), আনোয়ার হোসেন আনু (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), আব্দুল মান্নান (পাকবাহিনীর হাতে শহীদ), এস. এম. দাউদ আলী (পরবর্তীতে ভিপি), মোঃ আবু জাফর, ইত্তেহাদুল হক, শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু, মুন্সি আইয়ুব হোসেন, শেখ মাহাতাব উদ্দিন, মোকলেছুর রহমান বাবলু, রবিউল ইসলাম খান চৌধুরী তিনু ও মেজর (অবঃ) শেখ জামশেদ হোসেন। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে গল্লামারী বেতার কেন্দ্র, পাইকগাছা হাইস্কুল, বারোআড়িয়া, কপিলমুনি, লায়ন্স স্কুল, ভোমরা, পারুলিয়া, খানজিয়া ও কালীগঞ্জের যুদ্ধে অংশ নেন।

শহীদ আব্দুল মান্নান

এ কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল মান্নান। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। অংশ নিতেন মিছিল, মিটিং-এ। মার্চের শেষ দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তিনি থাকতেন সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ মসজিদে তৈয়েবার পেছনে। পাকবাহিনী শহরের বিভিন্ন স্থানে সেনা ছাউনী স্থাপনের পর নিজেকে নিরাপদ মনে না করে শহরতলীতে যেয়ে অবস্থান নেন। এক মাস বিভিন্ন সহপাঠীদের বাড়িতে অবস্থান করার পর মে মাসে ভারতে যেয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। জুলাই মাসের শেষ দিকে পরিবার পরিজনকে দেখতে সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ বাড়িতে আসেন। গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে পাকবাহিনী তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে কয়েকদিন আটকে রাখে। শারীরিকভাবে নির্যাতন করায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে হত্যা করে গল্লামারী ময়ুর নদে তীরে ফেলে দেওয়া হয়। তার লাশের সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার আসাদপুর গ্রামের মঙ্গল মিয়ার পুত্র তিনি। শহীদের স্মরণে কমার্স কলেজে ব্যয়ামাগারের নামকরণ করা হয় আব্দুল মান্নানের নামানুসারে।

শহীদ আনোয়ার হোসেন আনু

খুলনা জেলায় সবচেয়ে বড় রাজাকার ক্যাম্প ছিল পাইকগাছা থানার কপিলমুনিতে। কপোতাক্ষ নদের তীরে কপিলমুনি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র। এ বাণিজ্য কেন্দ্রের মধ্যবর্তী স্থানে রায় সাহেব বিনোদ বিহারীর পরিত্যক্ত বাড়িতে। শান্তি কমিটির পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে রাজাকার ক্যাম্প। ৬ ডিসেম্বর যশোর সেনানিবাসের পতনের পরও কপিলমুনি বাজারের রাজাকাররা আত্মসমর্পনে রাজি হয়নি। মিত্রবাহিনীর কয়েকটি গ্রুপ সাতক্ষীরা ও যশোরের মুক্তাঞ্চলে অবস্থান করে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে শত্রুদের পরাজিত করার পর মুক্তিযোদ্ধারা কপিলমুনি ক্যাম্প দখলের পরিকল্পনা করে। রাজাকার ক্যাম্প দখলের জন্য দিনক্ষণ চুড়ান্ত হয় ৪ ডিসেম্বর। যুদ্ধের সমন্বয়কারী হিসেবে দাযিত্ব পালন করেন বৃহত্তর খুলনা মুজিববাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু। কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নৌ কমান্ডার গাজী রহমতুল্লাহ দাদু বীর প্রতীক। ৭ ডিসেম্বর রাজাকার ক্যাম্পের পতন হয়। যুদ্ধে তিনজন শহীদ হন। তার মধ্যে একজন কমার্স কলেজের ছাত্র আনোয়ার হোসেন আনু। ৭১ সালে তিনি বি.কম শেষবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছাত্রলীগের নীতি আদর্শে বিশ্বাসী। খুলনার রূপসা থানার মুছাব্বরপুর গ্রামের শেখ মিরাজউদ্দিনের পুত্র। সবুরুন্নেছা তার মা। প্রথমে তালা থানার শাহাজাতপুর গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী রূপসা থানার মুসাব্বরপুর গ্রামে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। ২৬ মার্চের পর দিন খুলনা নগরীর শিল্প শহর খালিশপুরে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ভারতের টেন্ডুয়ায় গেরিল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

বিজয়ের পর ক্যাম্প

১৭ ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত হয়। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা খুলনায় আসতে শুরু করে। বৃহত্তর খুলনা মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকুর তত্বাবধায়নে কমার্স কলেজে ক্যাম্প স্থাপন হয়। এখানে পাঁচ’শ মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেয়। ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় স্বাধীনতার স্থপতি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেন। তারপর যার যার কর্মস্থলে ফিরে যায়। বিধ্বস্ত খুলনা শহরের পুনর্বাসনের জন্য ভারতের আনন্দ মার্গী নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এ কলেজে এসে অবস্থান করে। তারা মার্চ পর্যন্ত খুলনা শহরে পুনর্বাসনের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

(লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, খুলনা প্রেসক্লাব ও নির্বাহী সম্পাদক, খুলনা গেজেট)

তথ্য সূত্র :

* ড. শেখ গাউস মিয়া রচিত বৃহত্তর খুলনা : আলোকিত মানুষের সন্ধ্যানে।
* স.ম. বাবর আলী রচিত স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান।
* গৌরাঙ্গ নন্দী রচিত বৃহত্তর খুলনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
* বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবু জাফর রচিত মুজিব বাহিনী খুলনা জেলা একাত্তর।
* প্রফেসর এস.এ হাসিবের সাক্ষাৎকার।
* প্রাক্তণ শিক্ষার্থী আব্দুস সবুরের সাক্ষাৎকার।
* জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মোঃ আবু জাফরের সাক্ষাৎকার।

খুলনা গেজেট/এমএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!