খুলনা, বাংলাদেশ | ১০ বৈশাখ, ১৪৩১ | ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

Breaking News

ভারতবর্ষে নবীদের কবর

মুফতি আনিস বিন ওমর

পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাস অনেক পুরাতন। আদি পিতা হযরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে হযরত নূহ (আ.) এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এবং সভ্যতার বিকাশ বেড়েই চলছে। আল্লাহর সৃষ্টি পরিবারের মধ্যে মানুষ অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাখলুখ। সুরা বনি ইসরাইল-৭০। আল্লাহ তা’আলা মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু এবং মেহেরবান। বাকারা ১৪৩। তাই মানুষের হেদায়েতের জন্য তাদের কাছে পঠিয়েছেন অসংখ্য পথপ্রদর্শক, মহামানব। শয়তানের খপ্পরে পড়ে কেউ যেন পথভ্রষ্ট না হয় সেজন্য প্রতিটি জনপদে আল্লাহ তা’আলা পাঠিয়েছেন হাদী বা সঠিক পথের দিশারী। দেখিয়েছেন উভয় জগতের মুক্তির সহজ পথ।

কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে “আমি প্রতিটি জনপদে রসুল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে বিরত থাক”। সুরা নাহল -৩৬।

এমন কোন সম্প্রদায় নেই যেখানে সতর্ককারী আসেনি।- সুরা ফাতির -২৪।

আপনি একজন সতর্ককারী, আর প্রতিটি জাতির জন্য রয়েছে (ছিল) পথপ্রদর্শক। সুরা রা’দ- ৭।

উপরিউক্ত আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, প্রতিটি জনপদে আল্লাহ তা’আলা নবী বা রাসুল পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার জনপদ, নাম না জানা কত সম্প্রদায়, কত শত জাতি-গোষ্ঠি অতিবাহিত হয়েছে। অথচ পবিত্র কুরআনে মাত্র ২৫ জন নবী-রসুলের নাম পাওয়া যায়। হাদিস ও ইতিহাস গ্রন্থ খুঁজে যত নাম পাওয়া যায়, সব মিলে ৫০ এর বেশি হবে না।

এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- “আমি আপনার পূর্বে অনেক নবী-রাসুল পাঠিয়েছি, তাদের কারো ঘটনা আপনার কাছে বর্ণনা করেছি, আবার কারো ঘটনা আপনার কাছে বর্ণনা করিনি”। সুরা গাফের ৭৮।

সুরা নিসায় আল্লাহ তা’আলা কয়েকজন নবীর নাম উল্লেখ করার পর বলেন, “এছাড়াও এমন অনেক রাসুল পাঠিয়েছি যাদের ব্যাপারে ইতিপূর্বে আমি আপনাকে শুনিয়েছি এবং এমন অনেক রসুলও পাঠিয়েছি যাদের বৃত্তান্ত আমি আপনাকে জানাইনি”। সুরা নিসা ১৬৪।

স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, মাত্র ২৫-৫০ জনের নাম পাওয়া গেলেও নবী-রসুলের সংখ্যা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অসংখ্য নবী-রসুল দুনিয়াতে আগমন করেছেন এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট তাওহিদী দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন।

ভারতবর্ষেও কি নবী আসতে পারে

এর উত্তর পেতে আমাদের জানতে হবে ভারতবর্ষের মানব সভ্যতার ইতিহাস কতটা প্রাচীন। ঐতিহাসিক একটি বিবৃতি তুলে ধরা যাক-

‘রিয়াজুস সালাতিন’ গ্রন্থ প্রণেতা গোলাম হুসাইন সেলিম তার গ্রন্থে ইতিহসের এক অজ্ঞাত অধ্যায় উল্লেখ করেছেন।- “হযরত নূহ আ. এর যুগে যে মহাপ্লাবন অনুষ্ঠিত হয় তাতে দুনিয়ার সমস্ত কাফেরকুল সমুলে বিনাশপ্রাপ্ত হয়। নূহ আ. এর সাথে তার অনুসারী মুষ্টীমেয় কিছু মুসলমান রক্ষা পেয়ে যান। পরবর্তীকালে তাদের সাহায্যেই দুনিয়াতে মনুষ্য বসতি শুরু হয়। এ প্লাবনের পর নূহ আ. এর পুত্র ‘হাম’ তার পিতার অনুমতি নিয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে মনুষ্য বসতি স্থাপনের মনস্থ করেন। এ উদ্দেশ্য কার্যকর করার জন্য তিনি তার পুত্রদের দিকে দিকে প্রেরণ করতে থাকেন। হামের ৬ পুত্র ছিল। ১ম পুত্রের নাম ‘হিন্দ’, ২য় এর নাম ‘সিন্ধ’ ৩য় এর নাম ‘হাবাস’ ৪র্থ এর নাম ‘জানায’ ৫ম এর নাম ‘বার্বার’ এবং ৬ষ্ঠ পুত্রের নাম ‘নিউবাহ’। যে সব অঞ্চলে তারা উপনিবেশ স্থাপন করেন তাদের নামানুসারেই সেসব অঞ্চলের নামকরণ করা হয়। জ্যেষ্ঠপুত্র হিন্দের নামানুসারে তার আবাসভুমির নাম হয় হিন্দ। সিন্ধ জ্যেষ্ঠের সঙ্গে এসে সিন্ধুদেশে বসতি স্থাপন করেন”। বাংলাদেশে ইসলাম ২৪-২৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

উপরিউল্লিখিত উদ্বৃতিগুলো থেকে আমরা জানতে পারলাম; অনেক প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষে মানুষের বসবাস। অসংখ্য জাতি-সম্প্রদায় হাজার হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছে। আর আল্লাহ তা’আলা প্রত্যক সম্প্রদায়ের কাছে রসুল বা দূত পাঠিয়েছেন। তাহলে আমরা নির্দিধায় বলতে পারি ভারতের এসব জনবসতীতেও নবী-রসুলগনের আগমন ঘটেছিল।

এবার আসা যাক প্রবন্ধের শিরোনামের মূল বিষয় নিয়ে। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি এলাকার নাম ‘বারাস’। যেটা কোলাহোলমুক্ত একটি গ্রাম। খুব বেশি ঘনবসতিও না। এখানে রয়েছে একটি টিলার উপর বাউন্ডারি বা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি কবরস্থান। মধ্যে রয়েছে লম্বা লম্বা ৯টি কবর। বনজারের সরাইখানার স্টেশনের অদূরে অবস্থিত এই মাকবারাটি। ভিতরে ঢুকতে গেটে লেখা আছে ‘কুবুরে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম’। লম্বা লম্বা কবরগুলো কয়েক হাজার বছরের পুরাতন। একটি বাদে সবগুলো লম্বা প্রায় ৭ গজ। প্রসিদ্ধ আছে এগুলো নবীদের কবর।

‘হুসনুল আজীজ’ গ্রন্থে আছে, হযরত শায়খ আহমাদ সেরহিন্দী (মুজাদ্দিদে আলফে সানি) রহ. কাশফের মাধ্যমে দেখতে পান এখানে নবীদের কবর আছে। সেসব নবীদের আত্মার সাথে তার সাক্ষাত হয়েছে। তারা সংখ্যায় ১৩ জন। তাদের মধ্যে পিতা-পুত্রও আছেন। পিতার নাম ইবরাহিম। পুত্রের নাম হযর। ‘তাদের আগমনের সময় ছিল-জনৈক রাজা ‘কিরন’ এর যুগ। এটা আজ হতে প্রায় দুই আড়াই হাজার বছর পূর্বের কথা। আপবীতি ২/৫৪২ বাংলা।

মাওলানা সৈয়দ জাওয়ার হুসাইন রচিত জীবনীগ্রন্থ ‘হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ এর ১৮৬ পৃষ্টায় আছে- “এ বছর ১২ রবিউল আওয়াল ১০২৫হিজরী থেকে ১১ রবিউল আওয়াল ১০২৬ হিজরী পর্যন্ত দূর্যোগের সময় শেষ হলে একদিন হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ. সেরহিন্দের বাইরে দক্ষিণপূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে ‘বারাস’ অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেন। সে গ্রাম সংলগ্ন উত্তর দিকে একটি টিলা আছে। তিনি সেখানে তাশরিফ নিলেন। সেখানেই যোহরের নামায আদায় করলেন। নামাযের পর দীর্ঘক্ষণ মুরাকাবা করলেন। এরপর সাথীদের বললেন; কাশফের দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এখানে বহু নবীর কবর আছে। আত্মিক জগতে তাদের সাথে আমার সাক্ষাতও হয়েছে। আমি আরো জেনেছি- আল্লাহ তা’আলার গুনাবলি, পবিত্রতা ও মহাত্ম সম্পর্কে হিন্দুদের ধর্মগুরু যা কিছু লিখেছে , তা সেই আম্বিয়া আ. এর জ্ঞান-প্রজ্ঞা হতে চয়িত। এটা আম্বিয়া আ: এর হিজরতস্থল”।

মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ. তার পুত্র খাজা সাইদ রহ. কে পত্র লিখেছিলেন “বৎস! এ দীন (নগণ্য) যতদূর লক্ষ্য করেছে ও দৃষ্টিপাত করেছে, তাতে এমন কোন স্থান পায় না যেখানে আমাদের নবীগণের দাওয়াত পৌঁছেনি। এমনকি সীসাঢালা প্রাচীর দিয়ে আবদ্ধ ইয়াজুজ-মাজুজের মধ্যেও। অতীত উম্মতের পর্যালোচনা দ্বারা জানা যায়, এমন জায়গা খুব কমই রয়েছে যেখানে নবী প্রেরিত হয়নি। এমনকি ধারণাতীতভাবে ভারতের মাটিতেও। পত্র নং ২৫৯। রওজায়ে কউমিয়া ১৬২-৬৩”। আপবীতি ২/৫৪২-৪৩ বাংলা।

অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানিকে ইলহামের মাধ্যমে জানানো হয়েছিল এখানে নবীদের কবর আছে। তিনিই প্রথম কবরগুলো চিহ্নিত করেন এবং এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি তার খাস খলিফাদেরকে বলেছিলেন, নবীদের সাথে আমার স্বপ্নযোগে সাক্ষাত হয়েছে এবং আমার সুকুনে কল্ব হাসিল হয়েছে। আমি তাদের কবর থেকে নূর বের হয়ে আসমানের দিকে যেতে দেখেছি। (ড়ঁৎ রংষধস)

হযরত আশরাফ আলী থাবনী রহ. কবরগুলো নিয়ে মোরাকাবা করে বলেছিলেন “আমার মন সাক্ষী দেয় যে এগুলো নবীদেরই কবর”। অনেক বুযর্গ এই কবর জিয়ারত করেছেন। শাইখুল হাদীস হযরত জাকারিয়া সহ. হযরত জি ইউসুফ কান্ধলবী রহ., দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম মাও: রফিউদ্দিন সহ আরো অনেকে।

মাকবারার পশ্চিম দিকে রয়েছে ‘মসজিদে আম্বিয়া’। স্থানীয় এক মুরব্বির কাছে জানতে চাওয়া হলো ‘বাস্তবেই কি এগুলো নবীদের কবর? উত্তরে তিনি অনেক প্রমাণ পেশ করেন, যার কিছুটা উপরে বলা হয়েছে। আরো বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই আমরা জেনে এসেছি এগুলো নবীদের কবর। লক্ষ্য করলে দেখা যায় পুরো হিন্দস্তানে বড় বড় বুযুর্গদের যত কবর রয়েছে, দু’একটি বাদে সবখানেই বিদআতী কর্মকান্ড চালু আছে। অবাক ব্যাপার হলো যিনি আজীবন শিরক, বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন সেই মুজাদ্দিদে আলফে সানির কবরেও বিদআত চালু রয়েছে। কিন্তু এখানে আগেও কোন বিদআত ছিল না এখনো নেই। এতেই বুঝা যায় এগুলো নবীদের কবর”। (আওয়ার ইসলাম)

এসব আলোচনায় আমরা শতভাগ নিশ্চিত না হতে পারলেও খানিকটা জোর দিয়ে বলতে পারি, পাঞ্জাবের বারাসের ঐ কবরগুলি নবীদের কবর। এই সম্ভবনাই প্রবল। সাথে সাথে আমরা এটাও বুঝতে পারি যে, তাদের যামানা ছিল কয়েক হাজার বছর পূর্বের।

নাম না জানা কত শহর বা গ্রামে, দীপ বা উপত্যকায় মাটির নিচে হয়তো শুয়ে আছেন মানুষের মুক্তির কল্যানে জীবন উৎসর্গকারী অসংখ্য আম্বিয়াকে কেরাম। তাদের প্রতি বর্ষিত হোক খোদার দুরুদ। আলাইহিমুস সালাম।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ইমদাদুল উলূম রশিদিয়া মাদরাসা, ফুলবাড়িগেট , খুলনা।




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!