খুলনা, বাংলাদেশ | ২৫ শ্রাবণ, ১৪২৯ | ৯ আগস্ট, ২০২২

Breaking News

  গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ২২৭ জন ও ভাইরাসটিতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৭ জন

পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের সুযোগ : কারা কী বলছেন

গেজেট ডেস্ক

পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা নিয়ে বিএনপির সমালোচনাকে দলটির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

নির্ধারিত কর দিয়ে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার ঘোষণায় পাচারকারীরা আরও উৎসাহিত হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, এটা ঠিক সেইভাবে দেখলে হবে না। দেশের অনেক টাকা পাচার হয়ে গেছে। অন্যান্য দেশেও এই ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়। আমরা সেই সুযোগটা দিচ্ছি। আমরা দেখি, যদি এই সুযোগের সুফল না আসে তাহলে আমরা সুযোগটা উঠিয়ে নেব। এই বাজেটের দেওয়া সুযোগে আমরা সুফল পেতে পারি।

শনিবার বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মির্জা ফখরুলসহ দেশের একটি চিহ্নিত মহল ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থপাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে। তাদের বক্তব্য যদি সত্য হিসেবেই ধরে নেই, তাহলে সাত শতাংশ কর দানের মাধ্যমে কেউ যদি টাকা দেশে নিয়ে আসে, তাহলে মির্জা সাহেবদের খুশি হওয়ার কথা। এখন কেন তারা অভিযোগ করছে? অর্থপাচারের অভিযোগ তুলবেন, আর যখন টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেব, তখনো অভিযোগ করবেন, সেটা তো আপনাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, দ্বিচারিতা।’

অন্যদিকে বাজেটের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বলেন, ‘এই বাজেট কোনো অর্থেই সাধারণ মানুষের বাজেট নয়। এটা স্রেফ ডলার পাচারকারী ও অর্থ লুটেরাদের বাজেট।’

‘এবারের বাজেট বর্তমান কঠিন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত একটি বাজেট, এটি কেবলমাত্র সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদের জন্যই করা হয়েছে।’

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘পাচারকারীরদের অর্থকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা বিদেশে ভোজ করার বৈধ্যতাতেই এবারের বাজেট প্রনয়ণ করা হয়েছে। আরও পরিষ্কার অর্থে বললে সরকারের লুটেরা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী স্বজনদের অর্থ পাচার করার সুযোগ করে দিতেই এটা করা হয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের নিত্য ব্যবহৃত চাল, ডাল, লবণ, চিনি, গ্যাস, বিদ্যুত ও পানির মূল্য হ্রাসের কোনো কার্য্করী কৌশল না নিলেই শুধু নিজেদের বিত্ত বৈভব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বাজেট প্রণীত হয়েছে।’

পাচার করা অর্থ দেশে ফেরাতে ‘কর ছাড়’-এর প্রস্তাবকে আইনের পরিপন্থি অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘এই প্রস্তাব কেবল অনৈতিক নয়, এটা রীতিমতো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে ক্ষমা ঘোষণার শামিল। এতে বর্তমানে চলমান অর্থ পাচারের মামলাগুলোর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অর্থ পাচারকারীরা আরও উৎসাহিত হবে, টাকা আরও পাচার হওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে। এটা অন্যায়, অপরিনামদর্শী ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ।’

‘যেখানে পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনাই আইনগতভাবে প্রত্যাশিত সেখানে পাচারকারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের তথাকথিত জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অসাংবিধানিক। গত ১৪ বছরে সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকজনই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এখন এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার ওই সব পাচারকারীদের অবৈধ অর্থ বৈধ করার ঢালাও সুযোগ দিলো যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক যেকোনো মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য। আমরা পাচারকৃত অর্থ বৈধ করার এই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।’

একই সঙ্গে অবিলম্বে পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তাদের অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পাচারকারীদের অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব।

এফবিসিসিআই

এদিকে পাচার হওয়া টাকা বিনা প্রশ্নে দেশে আনার সুযোগ দেওয়াকে ব্যবসায়ীরা সমর্থন করেন না বলে জানিয়েছেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।

শনিবার (১১ জুন) এফবিসিসিআই কার্যালয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতি।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমরা আগেও বলেছি, পাচার হওয়া টাকা বিনা প্রশ্নে দেশে আনার সুযোগ ব্যবসায়ীরা সমর্থন করেন না। কারণ এ ধরনের সুযোগ দিলে সবাই এতে উৎসাহী হবে।

তিনি বলেন, আমি এখন ২২ থেকে ৩০ শতাংশ কর দিয়ে টাকা সাদা করব। অন্যদিকে বিদেশ থেকে ফেরত আনলে ১৮ শতাংশ ডিসকাউন্ট পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমরা এটা সমর্থন করি না। কারণ এতে ভালো ব্যবসায়ীরা এক্সপোর্টে নিরুৎসাহিত হবে।

এখন ডলারের সংকট তাই সরকার হয়তো ডলারের প্রবাহ বাড়াতে এ সুযোগ দিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা এটা সমর্থন করেন না।

টিআইবি

অন্যদিকে পাচার করা অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনতে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী যে সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটি বলছে, ‘পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন বিধান সংযোজনের অভূতপূর্ব অনৈতিক এক প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা সম্পূর্ণরূপে অসাংবিধানিক, সংশ্লিষ্ট আইনের সাথে সাংঘর্ষিক ও বৈষম্যমূলক এবং অর্থ পাচারের মত ঘৃণিত অপরাধের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার নামান্তর।’ এ প্রস্তাব বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী যেভাবেই ব্যাখ্যা করেন না কেন- নামমাত্র কর দিয়ে প্রশ্নহীনভাবে পাচার করা অর্থ বিদেশ থেকে আনার সুযোগ স্পষ্টতই অর্থ পাচারকারীদের অনৈতিক সুরক্ষা ও পুরস্কার প্রদান।’

অর্থপাচার রোধ আইন ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অর্থপাচার গুরুতর অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের আইন অনুযায়ী অর্থপাচারের শাস্তি পাচারকৃত অর্থ বাজেয়াপ্ত এবং তার দ্বিগুণ জরিমানা ও ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড নির্ধারিত। এই সুযোগ অর্থ পাচার তথা সার্বিকভাবে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে, যা সংবিধান পরিপন্থি এবং প্রধানমন্ত্রীর “দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা” ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

সিপিডি

পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার বৈধতা দেওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক— তিন ভাবেই অগ্রহণযোগ্য, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

শুক্রবার (১০ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২২-২৩, সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি এসব তথ্য জানিয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এর আগেও দেখা গেছে বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব কমসংখ্যকই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছে। এবার পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক— তিন ভাবেই অগ্রহণযোগ্য। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। যারা অবৈধভাবে অর্থ নিয়ে গেছেন তারা আইন ভঙ্গ করেছেন। আবার তাদেরকেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

পি কে হালদারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই ঘোষণার পর বিদেশে পালিয়ে থাকা কেউ একজন যদি কর দিয়ে টাকা নিয়ে আসতেন তাহলে কী করা যেত? তবে এ সুযোগ খুব একটা কাজে আসবে না বলে মনে করেন তিনি। বরং ভবিষ্যতে টাকা আরও পাচার হওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে কেউ টাকা দেশে ফেরত আনবেন না।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন তার উপস্থাপনায় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আলোচিত বিষয় হচ্ছে, বাইরে যারা টাকা নিয়ে গেছেন তাদের বিভিন্ন হারে কর দিয়ে দেশে টাকা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তাদেরকে কোনো ধরনের প্রশ্ন করা হবে না। তারা পাচার করা অর্থ বৈধ করতে পারবেন। এই ধরনের উদ্যোগ কর ন্যায্যতার পরিপন্থি এবং অনৈতিক। যারা সৎ করদাতা তাদের নিরুৎসাহিত করা হবে। অন্যদিকে, যারা অবৈধভাবে অর্থপাচার করে বিদেশে নিয়ে গেছেন, তাদেরকে প্রকান্তরে উৎসাহিত করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে দেশে অর্থ ফেরত আসবে না।

‘যারা দুর্নীতি ও ব্যাংক ঋণের অর্থ বিদেশে নিয়ে গেছেন তাদেরকে আবারও উৎসাহিত করা হয়েছে। এর আগেও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বহু দিন ধরে চললেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। সেজন্যই আমরা বলছি, এটা একটি ভ্রান্ত ও অনৈতিক পদক্ষেপ।’

 

 

খুলনা গেজেট/ আ হ আ




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692