খুলনা, বাংলাদেশ | ৩ ভাদ্র, ১৪২৯ | ১৮ আগস্ট, ২০২২

Breaking News

  গাজীপুরে প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে শিক্ষক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার
  ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুই হাজার ১৪ জন ও আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৩ জন

দশ টাকার মানি অর্ডার ও আমার প্রাপ্তি

এ এম কামরুল ইসলাম

সারদা পুলিশ একাডেমিতে একমাত্র আউটসাইড ক্যাডেট (ওসি) দের এক বছর বিনাবেতনে ট্রেনিং করতে হয়। নিজের খেয়ে, নিজের খরচে পুরো এক বছর ট্রেনিং করে পাশ করার পর চাকরি ও বেতন। আমার ছাত্রাবস্থায় এমন একটি কাজে যোগ দেয়া অত্যন্ত পীড়াদায়ক ছিল। আমরা সকল ক্যাডেট মাঝে মাঝে এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতাম।

সারদা পুলিশ একাডেমিতে বিভিন্ন শ্রেণির প্রশিক্ষণার্থী থাকে। তাদের প্রত্যেকের থাকা খাওয়ার জায়গা আলাদা আলাদা। বিশাল ট্রেনিং গ্রাউন্ডে একদলের সাথে অন্য দলের আলাপ আলোচনা করা বা মেলামেশার কোন সুযোগ নেই। ওখানকার নিয়ম-কানুন অত্যন্ত কঠিন। নিয়মের সামান্য ব্যতিক্রম হলে কঠোর সাজা ভোগ করতে হয়। তবুও সুযোগ পেলে অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে গোপনে আলাপ করতাম। অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে এএসপি, সার্জেন্ট, হাবিলদার, কনস্টেবল, ডিপার্টমেন্টাল ক্যাডেটদের সাথে কথা বলে জানলাম তারা সবাই মাসিক বেতন পায়। তারা যে যা বেতন পায় তা দিয়ে মাসের খরচ চলে যায়। তাই আমাদের মনটা খারাপ লাগতো। খারাপ লাগার আরো একটা কারণ ছিল। বাড়িতে সবাই জানে আমরা দারোগার চাকরি পেয়েছি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তলাশূন্য তা কেউ জানতো না।

হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম, আমাদেরকে মাসিক ট্রেনিং ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাও অতি নগন্য। মাসিক ৫৪০ টাকা। তাতেই আমরা মহাখুশি। একদিন সন্ধ্যায় রোলকলে সবাইকে ডেকে বেতন বিলে স্বাক্ষর নিয়ে মাসিক ভাতা দেয়া হলো। সেদিন আমাদের ব্যারাকে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সকল ক্যাডেট বাজারে গিয়ে ছোলা ভাজি থেকে শুরু করে যার মনে যা চায় সে তাই খেতে লাগলো। আমিও একই কাজ করলাম। কিন্তু পরদিন সকালে প্যারেড থেকে ফিরে একমাত্র আমি আইনের ক্লাসে যাবার আগে তড়িঘড়ি করে পোস্ট অফিসে গিয়ে একগাঁদা মানি অর্ডার ফরম নিয়ে এলাম।

সারাদিন ক্লাসে একটুও মন বসেনি। মাথার মধ্যে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছিলো সেই ৫৪০ টাকা আর মানি অর্ডার ফরমগুলো। আমার চাকরি জীবনের প্রথম অর্জন এই ৫৪০ টাকা। এই টাকা কোনোমতেই একা ভোগ করা যাবে না। অবশ্য সারদায় টাকার দরকার ছিল অনেক বেশি। প্রতিমাসে যত টাকা খরচ হতো এই ৫৪০ টাকা সে তুলনায় অতি নগন্য। কিন্তু জীবনে প্রথম চাকরি থেকে উপার্জনের এই ৫৪০ টাকা আমার এক অসাধারণ প্রাপ্তি বলে মনে হতে লাগলো। সুতরাং এই ৫৪০ টাকা কিভাবে কাকে কাকে পাঠালে বেশি বেশি তৃপ্তি পাবো এই চিন্তা আমাকে পেয়ে বসলো। আমি অনেকক্ষণ ভেবে ভেবে একটা লম্বা তালিকা প্রস্তুত করলাম। সেই লম্বা তালিকার প্রথমে ছিলেন আমার মা। তারপর একে একে আমার চাচা, এলাকার শুভাকাঙ্খী, আত্মীয়-স্বজন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ তালিকাভুক্ত হলেন। এই বিশাল তালিকায় ৫৪০ টাকা বিলি-বন্টন করতে গিয়ে প্রতি ভাগে ১০ টাকার বেশি সংকুলান করা গেল না। মনে মনে একটু লজ্জা লাগছিলো; তবুও সেই ১০ টাকা করে প্রত্যেককে মানি অর্ডার করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

একটা লম্বা তালিকায় ১০ টাকা করে মানি অর্ডার করার লজ্জা নিবারণ করতে গিয়ে মানি অর্ডার ফরমের নিচে একটা কৈফিয়ৎ লেখা আবশ্যক হয়ে পড়লো। কিন্তু সারদার ট্রেনিংয়ের মধ্যে এতগুলো কৈফিয়ৎ লেখার সময় বের করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার ছিল। তাই প্রায় সপ্তাহ খানেক সময় নিয়ে প্রতিটি মানি অর্ডার ফরমে কৈফিয়ৎ লিখে তারপর একদিন সারদা পোস্ট অফিসে গেলাম। পোস্ট অফিসের লোকজন আমার পাগলামি দেখে হাসাহাসি শুরু করলো। ওদিকে আমার কোনো বন্ধু আমার পাগলামি দেখে ফেললে আরো বেশি লজ্জা পেতে হবে, সে ভয়ও ছিল। শেষ পর্যন্ত লজ্জা জয় করে আমার প্রিয়জনদের কাছে ১০ টাকার মানি অর্ডার করতে পারায় মহা আনন্দ পেলাম।

এরপর এক এক করে যখন প্রাপকগনের প্রাপ্তি স্বীকার পত্র পেতে শুরু করলাম তখনকার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা আজ আর সম্ভব নয়। সেদিনের সেই ১০ টাকা প্রিয়জনদের পাঠিয়ে আমি যে তৃপ্তি পেয়েছিলাম, তা আজ এখানে লিখতে গিয়ে লজ্জা পেলেও সত্য প্রকাশে মহাতৃপ্ত হলাম।

সারদা ট্রেনিংয়ের সময় সবচেয়ে বেশি আনন্দের বিষয় ছিল চিঠি। কোনো প্রিয়জনের চিঠি পাওয়ার জন্য মনটা সদাই ডাক পিয়নের অপেক্ষায় থাকতো। সারদা পোস্ট অফিসের ডাক পিয়ন সেটা জানতো। তাই তিনি এমন সময় চিঠি বিলি করতে আসতেন যখন আমরা রুমে থাকতাম। তাতে চিঠি প্রাপকের হাসিমুখ দেখে ডাক পিয়ন নিজেও তৃপ্তি পেতেন এবং কিছু কিছু বকশিস পেয়ে খুশি হতেন।

আমাকে চিঠি লেখার মতো তেমন কেউ ছিল না; তাই তেমন চিঠিপত্র পেতাম না। সুতরাং ডাক পিয়নের সাথে আমার তেমন দেখা মিলতো না। অবশ্য ঐ ১০ টাকা পাঠানোর সুবাদে প্রাপকের কাছ থেকে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র ফেরৎ আসার কারণে ডাক পিয়ন সাহেবের সাথে আমার মোটামুটি দেখা হতে লাগলো। সারদার নিরস ও কষ্টকর জীবনে এটাও ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি।

এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলে সত্যের অপলাপ হবে। আমি বলেছি, সারদা ট্রেনিং এ যেয়ে ঐ ৫৪০ টাকা আমার জীবনে চাকরি থেকে পাওয়া প্রথম উপার্জন। আসলে সেটা পুরোপুরি সঠিক নয়; কারণ ১৯৮০ সালে দৌলতপুর সরকারি বিএল কলেজে বিএ অনার্স পড়াকালীন সময়ে একবার দৌলতপুর কৃষি কলেজে একটা চাকরি পেয়েছিলাম। সেখানেও দুই বছরের কৃষি ডিপ্লোমা কোর্স ছিল। তখন কৃষি ডিপ্লোমা কোর্সে চান্স পেলে মাসিক ২২০ টাকা করে ভাতা প্রদানের নিয়ম ছিল। বিএ অনার্স পড়াকালীন সময়ে আমি দৌলতপুর কৃষি কলেজের সামনে ‘নসীম ভিলা’ নামে একটা বাড়িতে লজিং থাকতাম। আমার অবস্থান কৃষি কলেজের সামনে হওয়ায় এলাকার ছোটবোন অপরাজিতা কৃষি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির আবেদন করার জন্য আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে সাথে নিয়ে কৃষি কলেজে আবেদন করতে গিয়ে দেখলাম আবেদন করার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে তার বয়স সামান্য কম আছে। সুতরাং তার আবেদন করা হলো না; বিধায় আবেদনের জন্য পূর্ব থেকে তার কেনা পোস্টাল অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছিল। এটা শুনে কৃষি কলেজের লাইব্রেরিতে কর্মরত আমার বন্ধু আবু সাঈদ ভাই আমাকে ঐ পদে আবেদন করার পরামর্শ দিলেন। তাতে ছোটবোন অপরাজিতার কেনা পোস্টাল অর্ডারের একটা সদ্গতি হবে। আমি সাইদ ভায়ের কথায় রাজি হয়ে আবেদন করলাম। যথারীতি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়ে গেলাম। হেলাফেলা করে একদিন কৃষি কলেজে ডিপ্লোমা কোর্সে যোগদান করায় প্রথম দিনই ২২০ টাকা ভাতা পেয়ে সোজা দৌলতপুর বাজারের তৎকালীন সবচেয়ে বড় কাপড়ের দোকান ‘বাংলাদেশ বস্ত্রালয়’ এ গিয়ে বললাম, ২২০ টাকায় যে শাড়ি হয় সেটা আমাকে দিন। সেখানে কাজ করতেন আমাদের পাশের গ্রামের জগদীশ বাবু। তিনি আমাদের পরিবারের বিশেষ পরিচিত। আমাকে তিনি ভীষণ স্নেহ করতেন। ২২০ টাকা দামের শাড়ি কেনার কথা শুনে তিনি বেশ অবাক হলেন; কারণ তখনকার দিনে ২২০ টাকা দামে বেশ উন্নতমানের শাড়ি পাওয়া যেতো। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবাকে হারানোর পর এত দাম দিয়ে শাড়ি কেনার সামর্থ আমার মতো একজন ছাত্রের থাকার কথা নয় তা তিনি জানতেন। তিনি আমার কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন, “শাড়িটা পরবে কে?”

আমি বললাম, ‘আমার মা’। অতএব, তিনি সেই ২২০ টাকায় আমাকে উন্নতমানের একটা মনের মতো শাড়ি দিলেন। আমি সেই শাড়ি নিয়ে সোজা গ্রামের বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতে দিয়ে বেহেস্তী সুখ অনুভব করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম চাকরি থেকে উপার্জন। সে অর্থে সারদা ট্রেনিং থেকে আমার মায়ের কাছে পাঠানো ১০ টাকা মানি অর্ডার ছিল দ্বিতীয় উপার্জন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ পরিবার। (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, অব.)

খুলনা গেজেট/ এস আই

 

 




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692