খুলনা, বাংলাদেশ | ১০ আষাঢ়, ১৪৩১ | ২৪ জুন, ২০২৪

Breaking News

  পাবনা সদর উপজেলার নতুন গোয়াইলবাড়ি এলাকায় পদ্মা নদীতে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু
  ব্লগার নাজিমুদ্দিন হত্যা : মেজর জিয়াসহ ৪ আসামির বিচার শুরু, ৫ জনকে অব্যাহতি

খুলনা : নগরায়নে পুরনো ভুলের খেসারতের শঙ্কা

কৌশিক দে

গেল কয়েক বছর জুড়ে খুলনায় বিশেষ করে মহানগরীতে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) কর্মকা- প্রতিনিয়ত নাগরিকদের দৃষ্টিতে রয়েছে। মহানগরীর এমন কোন এলাকা নেই যেখানে এই কর্মকা-ের বাইরে রয়েছে। একই সাথে চলছে রাস্তা, ড্রেন, পয়নিস্কাষণ ব্যবস্থার কাজ। নগর সংস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি খুলনার ওয়াসার পয়নিস্কাষণ ব্যবস্থার কাজ কোথাও একই সাথে আবার কোথাও এক কাজ শেষ হওয়ার পর অন্যটি শুরু হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অবসান হচ্ছে না। ‘ভাল কিছু পেতে কষ্ট সহ্য করতে হয়’ – এমন অবস্থায় নাগরিকদের দুর্ভোগ মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাই নিত্য যানজট, সড়ক বা রাস্তা বন্ধের কষ্ট নগরবাসীকে মেনে নিতে হচ্ছে। অবশ্য এসব নিয়ে আজ তেমন কিছু লিখতে চাই না। লিখতে চাই আমাদের নগর জীবনের ভবিষ্যত সম্ভাবনা, সংকট ও আশঙ্কা নিয়ে।

দেশের অন্যতম পুরনো নগর খুলনা। ১৮৮৪ সালে পৌরসভা নিয়ে যাত্রা করা সিটির বয়সই ১৩৯ বছর! এরপর ১৯৮৪ সালে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ও ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। ইতিহাস বলছে, নদী বেষ্টিত শহরটি ছিল অপার সম্ভাবনায়। এখানে একর পর গড়ে উঠেছে শিল্প-কল-কারখানা। দিনে দিনে পরিচিত পেয়েছে শিল্পাঞ্চলে। কিন্তু অতীত অপরিকল্পিত নগরায়নের খেসারতের অপেক্ষা করতে হচ্ছে আমাদের। খুলনা সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১২ সালে প্রণীত ‘মাস্টারপ্লান’ অনুযায়ী রাস্তাঘাট, সড়ক ও ড্রেন উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পে সম্ভাব্য জলবায়ূ পরিবর্তন, ডেল্টাপ্লানকে আমলে রাখা হয়েছে।

নগর সংস্থার দায়িত্বশীলরা বলছেন, দিন দিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। আবার নগর সংলগ্ন ভৈরব, রূপসা নদী দিন ভরাট হচ্ছে। প্রবাহমান খালগুলোও ন্যবতা হারিয়ে দখল ও দূষণে অস্তিত হারাতে বসেছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব মাথায় রেখে নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমুহ বাস্তবায়ন হলে রাস্তাঘাট, সড়ক ও ড্রেনগুলো গড়ে ছয় ইঞ্চি থেকে দু’ফুট পর্যন্ত উচ্চতা বাড়বে।

অবশ্য মাস্টার প্লাট অনুযায়ী নতুন রাস্তা-ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে আরেক বিড়ম্বনায় পড়েছেন পুরাতন বাড়ি ও স্থাপনার মালিকরা। বিশেষ করে নিচু এলাকায় অধিকাংশ স্থাপনা ড্রেন ও সড়ক (রাস্তা) থেকে নিচু হয়ে পড়েছে। অনেক আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার প্রথমতলা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পরিত্যক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদেও ধারণা করপোরেশনের ৭৩ হাজার হোল্ডিয়ের মধ্যে আরো কয়েক হাজার বাড়ি ও স্থাপনার নিচতলা (প্রথম তলা) পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার এসব কথা বিভিন্ন সময়ে নগরবিদদের আলোচনায়ও উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, অতীতের অপরিকল্পিত নগরায়নের খেসারত আমাদের দিতেই হবে। অধিকাংশ বাড়িঘর, স্থাপনা গড়ে উঠেছে নকশা ও অনুমোদন ছাড়াই। আবার সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান এসব স্থাপনা ও ভুমি ব্যবহারের নকশা/ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন, তারা বিষয়টি কোনদিনই মনিটরিং করেননি। মূল ভূমি থেকে কত উচ্চতায় ভবনের বেসমেন্ট নির্মিত হবে বা জলবায়ু পরিবর্তনজণিত সংকটের বিষয়টি চিন্তায় রাখেননি।

নগর পরিকল্পনাদি ও বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপচারিতায় বলেছেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জমি না থাকা প্রধান সমস্যা। সময়ের প্রয়োজনে তাদের ড্রেন ও রাস্তার উচ্চতা বাড়াতে হচেছ। এতে অনেক বাড়ি নিচু হবে। আবার রাস্তা-ড্রেন এক উচ্চতা হওয়ায় পানি জমে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হবে।
আবার কেউ কেউ অভিমত দিয়েছেন, ‘আমাদের নগরগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। অনেক বাড়ির অনুমোদন নেই। নগর সংস্থার সাথে অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। আমাদের সচেতনতার অভাবে অনেক ভাল কিছু নষ্ট হয়ে যায়। ড্রেনে নোংরা-আবর্জনা ফেলে নষ্ট করি। নদী-খাল ইজারা বন্ধ, কেসিসি-কেডিএসহ সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

পরিবেশবাদীদের ভাষ্যও অনেকটা স্পষ্ট। তারা বলছেন, খুলনা ও উপকূল জলবায়ূ পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তাই নগর সংস্থার সাথে পরিকল্পনা বা সমন্বয় করে কেডিএ-ওয়াসা, সড়ক বিভাগকে কাজ করা উচিত। কেমন স্থাপনা হবে, কোথায় হবে- এ বিষয়ে অনুমোদনের আগে নগর সংস্থার মতামত জরুরী।

এদিকে নগর সংস্থা বলছে, নগরের নাগরিকদের সকল প্রকার সেবা প্রদান করে আসছে সিটি করপোশেন। নগর সংস্থার নির্বাচিত পরিষদকে প্রতিনিয়ত জনগণের কাছে ভাল-মন্দের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু এখানে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ণে খুলনা উন্নয়ন কতৃপক্ষ (কেডিএ), ওয়াসা, জেলা পরিষদ, সড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, টেলিযোগ বিভাগ এমন কী জেলা প্রশাসনও কর্মকা- পরিচলনা করে। যার দায় নির্বাচিত পরিষদ হিসেবে নগর সংস্থাকেই নিতে হয়। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশন বা নগর সংস্থার সাথে সমন্বয় করে না। আর এই সমন্বয়নের অভাবেই সংকট সৃষ্টি হয়। নগরের যাত্রা থেকে সংশ্লিষ্টদের সমন্বয় থাকলে বর্তমানে যে সংকট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, সেটি ঘটার সুযোগ থাকতো না। এতে নাগরিকরা শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হবেন না। অনেক ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়বেন।

যা হোক, নাগরিক হিসেবে আমাদের মূল প্রত্যাশা ‘সেবা প্রাপ্তি’। পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে রাষ্টের নিয়ম-কানুন ও আইন মেনে চলা। আগামী দিনে যে সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, এর পিছনে অনেকাংশে দায়ী আমরা নাগরিকরাও। আমরা যেনতেন প্রকারে সবকিছুর সহজ সমাধান করেছি। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সুন্দর ও সংকটহীন জীবনের বিষয়গুলো আমলে নেয়নি। শহর বাস অযোগ্য হলে আমাদের প্রথম খেসারত দিতে হবে। নিয়ম ও পরিকল্পনা না মেনে ইমারত তৈরী, স্থাপনা গড়ে তোলার দায় থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো না। ইতিমধ্যে আমরা বিপদজনক যে ‘কূপ’ তৈরী করেছি, তা থেকে আমাদের বেড়িয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। সাধারণ নাগরিক থেকে নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো টিকে থাকার জন্য হলেও এ বিষয়ে ঐক্যমত জরুরী। আমাদের শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব আমাদের। এ তত্ত্বের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!