খুলনা, বাংলাদেশ | ২৫ বৈশাখ, ১৪২৮ | ৮ মে, ২০২১

Breaking News

  নাটোরের বাগাতিপাড়ায় স্বামী-স্ত্রীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার
  খুলনার সংগীতা হলের সামনে বালুর ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

খুলনার সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’র পাতায় প্রথম স্বাধীনতার পতাকা

কাজী মোতাহার রহমান

পহেলা মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ আগা ইয়াহিয়া খান দুপুর একটায় জাতির উদ্দেশ্য দেয়া ভাষণে জাতীয় পরিষদের তেশরা মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর দুপুরে দৌলতপুর বি এল কলেজে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলে ছাত্রলীগ কমার্স কলেজ চত্বর থেকে জঙ্গি মিছিল বের করে। প্রেসিডেন্টের ঘোষণার প্রতিবাদে খুলনা হাদিস পার্কে ছাত্রলীগের আহবানে বিকেলে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

শহরের সকল স্কুল কলেজ বন্ধ। ব্যাংক, বিমা, নিউজপ্রিন্ট মিলস, হার্ডবোর্ড, প্লাটিনাম, কেবল ফ্যাক্টরি, দাদা ম্যাচ ও বিএমসির উৎপাদনের চাকা বন্ধ ছিল। কালেক্টরেট ভবন, জেলা জজ আদালতের দরজাগুলো খোলা ছিল। দোসরা মার্চ থেকে ছয় মার্চ পর্যন্ত শহরে বেলা দুটা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ডাকে হরতাল পালিত হয়। সাত মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ আট মার্চ গল্লামারীস্থ রেডিও পাকিস্তান, খুলনা কেন্দ্র থেকে প্রচার হয়। আট মার্চ মহররম উপলক্ষে কর্মসূচি শিথিল ও নয় মার্চ হরতাল প্রত্যাহার করা হয়। তেশরা মার্চ শহিদ হাদিস পার্ক থেকে আওয়ামী লীগ এর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি স্টেট ব্যাংক (আজকের বাংলাদেশ ব্যাংক) এর সামনে পৌছলে টেলিফোন ভবন থেকে পাকিস্তান বাহিনী গুলি চালায়। গুলিতে জয়নাল আবেদিন, আমজাদ হোসেন, চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র মুসাসহ সাত জন শহিদ হন। এর প্রতিবাদে সার্কিট হাউজ, কালেক্টরেট ভবন ও জজ কোর্ট ছাড়া সর্বত্র কালো পতাকা ওড়ে।

ছাত্রলীগের খুলনা জেলা ও শহর শাখার প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে সাত মার্চ আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বাংলা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ কমিটিতে আহবায়ক নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। বি এল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন সহ সভাপতি, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক স ম বাবর আলী ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য হুমায়ুন কবির বালুকে যুগ্ম আহবায়ক, শেখ আব্দুল কাইয়ুম, ইস্কান্দার কবির বাচ্চু, শেখ শহীদুল হক, হায়দার গাজী সালাহউদ্দিন রুনু, হেকমত আলী ভূইয়া, আবুল কাশেম ইঞ্জিনিয়ার, ফ ম সিরাজুল হক, মাহাবুবুল আলম হিরন, শেখ শওকত আলী ও মিজানুর রহমানকে সদস্য করে সংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দুই থেকে পঁচিশ মার্চ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করে।

সাত মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ায় খুলনাবাসি খাজনা ও ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করে দেয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকারকে সর্বত্র অসহযোগিতা করে। অসহযোগ আন্দোলনে প্রতিদিন রূপসা, খালিশপুর, দৌলতপুর, আটরা ও শিরোমনি শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দাকোপ ও পাইকগাছা ছাড়া অন্য থানাতে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ লাগেনি।

আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা জানাতে আঠারো মার্চ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি বদিউল আলম (স্বাধীনতা পরবর্তী সংবাদকর্মী) ও যশোরের রবিউল আলম খুলনায় আসেন। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা খুলনাঞ্চলে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নমুনা স্থানীয় নেতৃবৃন্দের হাতে তুলে দেন। প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলতে হয় ১৯৭০ সালের সাত জুন মাসে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইকবাল হলে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের পতাকা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেন। গাঢ় সবুজের মাঝে লাল সূর্য তার ওপরে দেশের ম্যাপ দিয়েই পতাকা চূড়ান্ত করা হয়।

তখনকার দিনে সাধারণত বিত্তবান পরিবার, ঠিকাদার, আইনজীবী ছাড়া খুলনা শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারে টেলিফোন সংযোগ ছিল না। উনিশ মার্চ ডাকসুর সহ সভাপতি আ স ম আব্দুর রব পিকচার প্যালেসে টেলিফোন করে শেখ আব্দুল কাইয়ুম ও স ম বাবর আলীকে তেইশ মার্চ খুলনায় স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলনের নির্দেশনা দেন। পতাকার নমুনা সম্পর্কেও ধারণা দেন। তেইশ মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে বাংলাদেশ দিবস পালনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টিও নির্দেশনা দেন। জেমস ফিনলের শ্রমিক নেতা মমতাজ হোসেনের আর্থিক সহায়তায় শহরের বড় বাজারের তুলো পট্টি থেকে হুমায়ুন কবির বালু ও শেখ আব্দুল কাইয়ুম শতাধিক পতাকা তৈরি করে নিয়ে আসেন। পতাকা প্রতিটি দশ/বারো টাকা করে বিক্রি হয়। পতাকা জনগনের মধ্যে বিক্রি করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম ও শেখ আব্দুল কাইয়ুম সহ আরও পাঁচ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শহিদ হাদিস পার্কের দক্ষিণ গেটের অদূরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিশ মার্চ খুলনা থেকে প্রকাশিত লুৎফর রহমান জাহাঙ্গীর সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক দেশের ডাক’ পত্রিকার পূর্ণ পাতায় চার রং-এ বাংলাদেশের পতাকা ছাপা হয় (সম্পাদকের জীবনী)। ক্লে রোডে হ্যানিমান মার্কেটে ছিল ‘সাপ্তাহিক দেশের ডাক’ এর কার্যালয়। ডাকবাংলা মোড়স্থ আজকের আইএফআইসি ব্যাংকের কাছেই ছিল নটরাজ প্রেস। এ প্রেস থেকেই সাপ্তাহিক দেশের ডাক ছাপা হত। দেশের ডাকের সকল সংখ্যা বিক্রি হয়ে যায়। পত্রিকার সকল সংখ্যা বিক্রি হয়ে গেলে বাংলাদেশের পতাকা ব্লক করে কাগজে ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে বিলি করে। স্যার ইকবাল রোডস্থ মির্জাপুর এলাকায় মঞ্জুরুল ইমামের বাস ভবন সংলগ্ন খুলনা ব্লক আর্ট এ ব্লক তৈরি করা হয়। এক ইঞ্চি কাঠের ওপর জিঙ্ক জমাট বেঁেধ ব্লক তৈরি হত। খুলনা ব্লক আর্টের মালিক নারায়ন চন্দ্র তালুকদার চব্বিশটি ব্লক তৈরি করেন। এ ব্লক রাজশাহী পর্যন্ত পাঠানো হয়। আওয়ামী নেতা মঞ্জুরুল ইমামের অনুরোধে গোপন স্থানে বসে ব্লকগুলো তৈরি করেন। এ জন্য তিনি পারিশ্রমিক নেননি। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সাপ্তাহিক দেশের ডাকে পতাকা ছাপানোর খবর সার্কিট হাউসে পাকিস্তানি সেনা সদর দপ্তরে পৌছে যায়। মুসলিম লীগ সমর্থকদের পরামর্শে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নটরাজ প্রেস আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সমর্থকরা ‘দেশের ডাক’ সম্পাদক লুৎফর রহমান জাহানগীরকে হত্যা করার জন্য শহরে খুঁজতে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে সামরিক আইনে ‘দেশের ডাক’ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। স্বাধীনতার পর আর কখনও ‘দেশের ডাক’ প্রকাশিত হয়নি।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ ইয়াহিয়া খান একাত্তরের এক মার্চ ১১০ নং সামরিক বিধি জারি করেন। এই বিধিতে বলা হয় পাকিস্তানের অখন্ডতা, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও ছবি, খবর, কোনো অভিমত, বিবৃতি, মন্তব্য ইত্যাদি সংবাদপত্রে মুদ্রণ করা যাবে না। এ বিধি লংঘন করলে সর্বোচ্চ শাস্তি দশ বছরের সশ্রম কারাদন্ড (বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রকাশনা সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা)। খুলনার সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’ সামরিক বিধি জারি করার পর তা ভঙ্গ করে। ছাব্বিশ মার্চ প্রেসিডেন্ট ৭৭নং সামরিক বিধি জারি করে। এ বিধিতে বলা হয়, পাকিস্তানের অখন্ডতা বা সংহতির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনা বা সমালোচনার চেষ্টা করলে সাত বছর কারাদ-। কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র না নিয়ে রাজনৈতিক বিষয় সংবাদপত্রে মুদ্রণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সাপ্তাহিক মুক্তি ছাড়া আর কোনও পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি।




আরও সংবাদ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692