খুলনা, বাংলাদেশ | ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ | ২৬ মে, ২০২৪

Breaking News

  ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে ‘রেমাল’, মোংলা-পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত
  উপকূলীয় এলাকায় লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশ

ঈদের আগে পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধসহ ৬ দফা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঈদুল ফিতরের আগে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং বন্ধ সকল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালুসহ ৬ দফা দাবি জানিয়েছে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ। মঙ্গলবার (২১ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১ টায় খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের আহবায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২০ সালের ২ জুলাই সরকার ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়। মিল বন্ধের দুই মাসের মধ্যে সকল পাওনা পরিশোধের অঙ্গীকার করলেও এখন পর্যন্ত অনেক শ্রমিক এরিয়াসহ তাদের বকেয়া পাওনা পায়নি। খুলনার খালিশপুর জুট মিল ও দৌলতপুর জুট মিল, সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল এবং চট্টগ্রামের কেএফডি ও আর আর জুট মিলের শ্রমিকরা এখনো বকেয়া কোন টাকা পায়নি।

এছাড়াও বিভিন্ন মিলের শ্রমিকরা যাদের মামলা আছে তাদের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করে বকেয়া টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে না। অনেকে সঞ্চয়পত্রের কাগজ এখনো পাননি। ফলে শ্রমিকরা নিদারুণ যন্ত্রণা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বর্তমানে জীবনযাপন ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মহীন এবং বকেয়া পাওনা থেকে বঞ্চিত শ্রমিকরা তাদের পরিবার পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে। রোজা এবং ঈদুল ফিতর সমাগত। ঈদের আগে সকল শ্রমিকের বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং সঞ্চয়পত্রের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, মুক্তবাজার নির্ভর পুঁজিবাদী উন্নয়ন দর্শন, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফসহ দাতা তুষ্টির নীতি, পরিকল্পনাহীনতা ও ব্যবস্থাপনা অদক্ষতার কারণে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। পাটের কৃষি, পাট বাজারজাতকরণ, পাটের ব্যবসা-বাণিজ্য, পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্প কলকারখানাসহ আনুমানিক ৪ কোটি মানুষের জীবন জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত সমগ্র পাট অর্থনীতি। পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক তন্তু পাটের প্রায় ৪০ ভাগই আমরা উৎপাদন করি এবং পরিবেশ বিপর্যয়কারী নাইলন-পলিথিন সিনথেটিকসহ ক্ষতিকর কৃত্রিম তন্তুর বিপরীতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আমাদের আছে নিরঙ্কুশ তুলনামূলক প্রাকৃতিক সুবিধা। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সারা বিশ্বে পাট পণ্যের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়াও পাট দিয়ে নানা রকমের পরিবেশবান্ধব পণ্য আবিষ্কার করা হচ্ছে। ফলে সারা বিশ্বে পাটের বাজার বিপুল বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেশী কয়েকটি পাট উৎপাদনকারী দেশসহ এমনকি সেসব দেশেও যারা পাট উৎপাদন করে না তারা যখন নতুন নতুন পাটকল স্থাপনসহ পাট অর্থনীতি বিকশিত করছে এবং পাটপণ্যের যখন বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে ও ভবিষ্যতে যখন নিশ্চিতভাবে বহুমুখী ব্যবহার আরো সম্প্রসারিত হবে তখন আমরা আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করেছি। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের আকালে আমাদের পাট অর্থনীতির সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত চার কোটি মানুষের জীবন জীবিকা। পাটকল বন্ধের ফলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের সন্তান-সন্ততিসহ পরিবার-পরিজনের যে দুর্দশা-দুর্গতি, পাট বাজারজাতকরণে পাটচাষীদের যে বেহাল দশা, সর্বোপরি সমগ্র পাট অর্থনীতি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণে যে অস্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতার অভাব তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। অথচ বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দিনদিন বাড়ছে।

বর্তমানে বৈশ্বিক বাজার সঙ্কটকালে এটা আমাদের জন্য সুখবর। কাঁচামাল থেকে শুরু করে পাটপণ্য উৎপাদনের বেশিরভাগ উপকরণ দেশেই উৎপাদিত হয়। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকলে মুলধনী সামগ্রীও দেশেই উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি আমাদের দেশের প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় কৃষিভিত্তিক শিল্প সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট এখন খুব ঘনঘন দেখা দিচ্ছে। ফলে সঙ্কট মোকাবিলা করে নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষা করতে হলে আমাদের কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, অভ্যন্তরিন বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং বিদেশের বাজারেও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করে বিপুল আয় করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। অথচ সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে তথাকথিত নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্ব কাঠামোর মধ্যে বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে আসলে পরিকল্পিত শিল্পায়ননীতির পরিবর্তে সমগ্র পাটখাতকে ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দিয়ে জাতীয় সম্পদ লুটপাট ও ব্যক্তি পুঁজিপতির যথেচ্ছ মুনাফার সুযোগ করে দিয়েছে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকল শ্রমিকদের মজুরি বর্তমান নিত্যপণ্য ও জীবনযাপনের অবশ্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজারদর এবং ন্যূনতম পুষ্টিমান প্রাপ্তির সক্ষমতার নিরিখে অমানবিক বললেও কম বলা হয়। মজুরি কমিশনের আওতাভুক্ত শ্রমিকদের কর্মচ্যূত করে সকল পাটকল শ্রমিকদের মজুরি ব্যক্তি মালিকানাধীন শ্রমিকদের স্তরে নামিয়ে এনে এবং চাকরিচ্যূতির ভয়ে ভীত শ্রমিকরা যাতে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে অংশ না নেয় সেই পরিবেশ তৈরি করে ব্যাপক মুনাফা করার সুযোগ সৃষ্টি করাও সরকারের লক্ষ্য বলে আমরা মনে করি।

পাট চাষ এবং পাট শিল্পের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি জড়িত। বাংলার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ পাট। উন্নত মানের পাটের যোগান সহজলভ্য হওয়ায় পাকিস্তান আমলে পাট শিল্প ছিল একক বৃহত্তম শিল্প।

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সহ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সাথেও পাট শিল্প শ্রমিকরা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর ৭৭টি পাটকল জাতীয়করণ করার মধ্য দিয়ে বিজেএমসি’র যাত্রা শুরু হলেও তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮২ সালে বিজেএমসি’র অধীনে পাটকল ছিল ৮২টি। কিন্তু তারপর থেকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এর পরামর্শে এই পাটকলগুলো বন্ধ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। বিগত দিনে বিভিন্ন সময়ে আমরা এই ষড়যন্ত্রের কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি এবং আপনারাও তা স্পষ্ট করে জানেন। অথচ মাত্র ১২শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই পার্টকল গুলোকে লাভজনক করা সম্ভব বলে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে এবং সরাসরি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা বিবেচনায় নেয়নি।

২০১০ সালে পাশকৃত ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট’ বাস্তবায়নে সরকারের জোর তৎপরতা আমরা দেখিনি। এসবের মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। অর্থের অভাব এই পাটকলগুলো বন্ধের কারণ নয়। অলাভজনক অনেক খাতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির নামে ব্যক্তিমালিকদের লুটপাট করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে সীমাহীন লুট চলছে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, পাটকল বন্ধ করার পরও প্রতিবছর বিজেএমসি কর্মকর্তাদের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। আসলে পাটকলগুলোর সম্পদের প্রতি এদেশের বড় পুঁজিপতিদের নজর পড়েছে। এখন সরকার লিজ দিতে চাইলেও একদিকে বৈশ্বিক বাজার সঙ্কটে নতুন কারখানা স্থাপনে সময় নেয়া এবং লিজ নীতিমালাকে সরকারের সাথে যোগসাজশে আরও সহজ করার ষড়যন্ত্র চলছে।

পরিষদের ৬ দফা দাবি হচ্ছে- ১) ৫টি পাটকল (খালিশপুর জুট মিল, দৌলতপুর জুট মিল, জাতীয় জুট মিল, কেএফডি, আরআর) শ্রমিকসহ যেসকল শ্রমিকরা এখনও তাদের বকেয়া পাওনা পায়নি তাদের পাওনা আগামী ঈদ-উল-ফিতরের আগে পরিশোধ করতে হবে। যে সকল শ্রমিকরা সঞ্চয়পত্রের কাগজ পাননি তাদের অবিলম্বে তা হস্তান্তর করতে হবে।

২) রাষ্ট্রায়ত্ত সকল পাটকল অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালু করতে হবে। লোকসানের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে
জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সহ শাস্তি দিতে হবে।

৩) ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকল শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করতে হবে এবং তাদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি নিত্যপণ্যের বাজারদর, শ্রমিক ও তার পরিবারের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপাদানের মূল্য, দক্ষতা এবং ব্যয়িত শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।

৪) ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং এ্যাক্ট’ বাস্তবায়ন করতে হবে। সময়ের চাহিদা বিবেচনা করে পাট থেকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের জন্য
গবেষণাখাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে।

৫) বিজেএমসি’র মাথাভারি প্রশাসন থেকে অতিরিক্ত জনবল ছাটাই করতে হবে। পাট মন্ত্রণালয়ের অযাচিত খবরদারি বন্ধ করে
রাষ্ট্রায়ত পাটকল পরিচালনা সংস্থাটিকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পাটকল পরিচালনা সংশ্লিষ্ট দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের পদায়ন করতে হবে। পাটকলগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্বকে শ্রমিকদের কাছে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

৬) পাটকল রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের নামে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক জনার্দন দত্ত নান্টু, আ ফ ম মহসিন, মোজাম্মেল হক খান, মনির আৌধুরী সোহেল, মিজানুর রহমান বাবুকোহিনুর আক্তার কনাসহ পরিষদের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন পাটকলের শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে আগামী ৭ এপ্রিল রাজঘাট, ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন গেট ও ১৫ এপ্রিল খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে জনসভার ঘোষণা দেওয়া হয়। দাবি আদায় না হলে ঈদের পর বিভাগীয় সমাবেশের ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!