খুলনা, বাংলাদেশ | ২০ ফাল্গুন, ১৪২৭ | ৫ মার্চ, ২০২১

Breaking News

  শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় : হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের রায়; অপরাধ যাই হোক, সাজা ১০ বছরের বেশি নয়
তাইওয়ানে পঁচা পাট রপ্তানি করে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট

নাসা জুট ট্রেডিংয়ের কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত অন্যরা ধরা ছোয়ার বাইরে!

বিশেষ প্রতিনিধি

লাইসেন্স নেই, তারপরও তিনি কাগজপত্র জাল জালিয়াতি করে তাইওয়ানে পাট রপ্তানি করেছেন। ব্যাংক থেকে এলসির টাকাও তুলে নিয়েছেন। কিন্তু নমুনা অনুযায়ী পাট না দিয়ে পঁচা পাট দেওয়ায় তাইওয়ানের আমদানিকারক বাংলাদেশ সরকারকে অভিযোগ করার পর এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। পাট অধিদপ্তর এই অভিযোগে খুলনার নাসা জুট ট্রেডিং লিমিটেডের মালিক কাজী নজরুল ইসলামের নামে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় বলা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট এবং আন্তর্জাতিক প্রতারণা / অপরাধ করেছেন। তবে পর্দার আড়ালে থেকে যাচ্ছে এ প্রতারণা/অপরাধের সাথে জড়িত অন্যরা।

পাট অধিদপ্তর দৌলতপুর খুলনার মুখ্য পরিদর্শক এ এম আখতার হোসেন জানান, তাইওয়ানের  AUDREY Trading Co Ltd. বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগে জানিয়েছে, নাসা জুট ট্রেডিং, ৫১৪ যশোর রোড়, দৌলতপুর খুলনা হতে গত বছর জুলাই মাসে ৪৩.১৪৩ মেট্রিক টন পাট আমদানি করে। কিন্তু তারা নমুনা অনুযায়ী পাট সরবরাহ করেনি। পঁচা ভেজা নষ্ট কাটিং পাট সরবরাহ করে, যার ভিডিও অভিযোগের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগে এই রপ্তানিকারকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ২৯ হাজার ইউএস ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে তাইওয়ানের ঐ আমদানিকারক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে বিষয়টি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সওদাগার মুস্তাফিজুর রহমান গত ২৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখে পত্র দিয়ে সহকারী পরিচালক পাট ও বস্ত্র, মুখ্য পরিদর্শক ,পাট অধিদপ্তর এবং খুলনা জেলা প্রশাসককে জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন।

এই পত্রের পর মুখ্য পরিদর্শক এ এম আখতার হোসেন খুলনা তদন্ত করে দেখেন নাসা জুট ট্রেডিংয়ের মালিক কাজী নজরুল ইসলাম নামে খুলনাতে কোন পাট রপ্তানিকারক নেই। ৫২৪ যশোর রোড়ে অফিস থাকলেও কোন সাইন বোর্ড নাই। তিনি এই পত্রে উল্লেখ করেন যে পাট রপ্তানির লাইসেন্স না করে পাট রপ্তানি করে নাসা জুট টেডিং এর মালিক কাজী নজরুল ইসলাম পাট আইন ২০১৭ এর ৫[১] ধারা লংঘন করে দন্ডনীয় অপরাধ করেছেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেন।

এই সুপারিশ মোতাবেক পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সওদাগার মুস্তাফিজুর রহমান ১৯ নভেম্বর ২০২০ স্বারক নং- ২৪,০১.০০০০.০০৪.৭১.১১ [অংশ ২] ১৬-১২৮ নাসা জুট ট্রেডিং এর বিরুদ্ধে বিনা লাইসেন্স পাট ব্যবসা পরিচালনা এবং বিদেশে পাট রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক প্রতারণা/অপরাধ এবং তা বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার অপরাধে মামলা করার নির্দেশ দেন।

এই নির্দেশনার ভিত্তিতে পাট অধিদপ্তরে মুখ্য পরিদর্শক এ এস আকতার হোসেন বাদী হয়ে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলা করেন । মামলায় আসামী করা হয়েছে নাসা জুট ট্রেডিং মালিক কাজী নজরুল ইসলাম, পিতা মৃত আব্দুস জব্বার। অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পাট রাপ্তানির লাইসেন্স ব্যতিত ব্যবসার উদ্দেশ্যে গত ০৬/০৭/২০ তারিখে ৪৩.১৯৩ মে:টন মেস্তা কাটিং পাট [পঁচা পাট ] তাইওয়ানের  AUDREY Trading Co Ltd  এর নিকট রপ্তানি করে, পাট আইন ২০১৭ এর ৫[১] ধারা লংঘনজনিত অপরাধ ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করেছেন।

তবে প্রবীণ পাট রপ্তানীকারক আকুঞ্জী ব্রাদার্স এর হারুন অর রশিদ এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “পাট অধিদপ্তর, বিজেএ, ব্যাংক, শুল্ক, আয়কর, বন্দর কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দেয়া এককভাবে একাজ করা সম্ভব নয়। কারণ বন্দর, শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং ব্যাংকে লাইসেন্স হালনাগাদ কাগজপত্র জমা দিতে হয়। সেখানে একক ভাবে কোন বেআইনী কাজ করা সম্ভব নয়।” তিনি দাবি করেন, “ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা জড়িত না থাকলে একাজ করা সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, “লাইসেন্স ছাড়া পাট রপ্তানি আর পাটের পরিবর্তে পঁচা পাট রপ্তানি, ব্যাংক হতে অর্থ উত্তোলন ঘটনার সাথে বড় কোন চক্র জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি অর্থ পাচার ঘটনা হতে পারে, কারণ তাইওয়ান থেকে অভিযোগ না এলে দেশে কেউই জানতে পারত না।”

সোনালী ব্যাংক দৌলতপুর কর্পোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোঃ জাকির হোসেন জানান, পাট রপ্তানির লাইসেন্সসহ যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকলে পাট রপ্তানি বা পেমেন্ট গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ এলসি এবং পেমেন্টের সাথে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিষ্টেম জড়িত। পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশন সনদ ব্যাংকে জমা দিতে হয়।

বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশন খুলনার সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী জানান, নাসা জুট টেডিং তাদের সদস্য নন এবং পাট রপ্তানিকারক নন, সে আন্তর্জাতিক প্রতারক। তিনিও দাবি করে এককভাবে নজরুল ইসলামের পক্ষে একাজ করা সম্ভব নয়। তার ধারনা ‘বড় ছক্র’ জড়িত থাকতে পারে।

নাসা জুট টেডিংয়ের দৌলতপুর ঠিকানায় গেলে অফিস বন্ধ পাওয়া যায়। স্বত্ত্বাধিকারী কাজী নজরুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি এই মামলায় কিছুদিন জেলে থাকার পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি লাভ করেছেন। তিনি নতুনভাবে সব লাইসেন্স করতে দিয়েছেন। ঢাকার মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংকের একটি শাখায় তাইওয়ানে পাট রপ্তানির জন্য এলসি এসেছিল। তিনি বলেন, তাইওয়ানে পাট আমদানীকারকের সাথে তিনি সমঝোতা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার প্রধান এড. কুদরতে খোদা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, পাট রপ্তানির পূর্বে সার্ভে করতে হয় এবং সার্ভে রিপোর্টসহ নানা কাগজপত্র ব্যাংকে জমা এবং একাধিক সংস্থা যাচাই-বাচাই করে। সেখানে পাট রপ্তানির লাইসেন্স না থাকার পরও এলসি এবং পেমেন্ট গ্রহণ বিস্ময়কর ঘটনা।

খুলনা গেজেট/ টি আই

 




আরও সংবাদ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692